২২শে শ্রাবণ: বৃষ্টিভেজা বিদায়ে চিরন্তন রবীন্দ্রনাথ

“মৃত্যু যেদিন বলবে, ‘জাগো, প্রভাত হল তোমার রাতি’—
নিবিয়ে যাব আমার ঘরের চন্দ্র-সূর্য দুটো বাতি।”

এই পংক্তির মতোই যেন ১৯৪১ সালের ২২শে শ্রাবণ দিনটি ছিল এক অবশ্যম্ভাবী বিদায়ের ঘোষণা। সেদিন ভোরের অঝোর বর্ষণ ঢেকে দিয়েছিল বাঙালির হৃদয়াকাশ। পৃথিবীর মঞ্চ ছেড়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বাংলা সাহিত্যের বিশ্বকবি, নোবেল বিজয়ী, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু তাঁর সৃষ্টির আলো নিভল না; বরং সময়ের সঙ্গে আরও উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে।


জন্ম ও শৈশব – জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির স্নেহের আবহ

১৮৬১ সালের ২৫শে বৈশাখ, কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে জন্ম নেন রবীন্দ্রনাথ। এক ধনী, শিক্ষিত ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের অন্যতম নেতা এবং গভীর ধর্মদর্শনের অধিকারী; মা সারদাসুন্দরী দেবী ছিলেন স্নেহশীলা গৃহিণী। ঠাকুরবাড়ির পরিবেশ ছিল সঙ্গীত, নাটক, সাহিত্য আর শিল্পকলার রঙে রঙিন—যেখানে ছোটো রবীন্দ্রনাথের শিল্পীসত্তার বীজ অঙ্কুরিত হয়।


প্রকৃতিপ্রেম ও বর্ষার টান

কবিগুরুর হৃদয়ে বর্ষা ছিল চিরন্তন মুগ্ধতার ঋতু। মেঘলা আকাশ, বৃষ্টির গন্ধ, নদীর ঢেউ—সবই তাঁকে অনুপ্রাণিত করত। বর্ষাকে তিনি একদিকে প্রেমের মিলনমঞ্চ হিসেবে দেখেছেন, আবার অন্যদিকে বিরহের করুণ সুরও শুনেছেন। তাই হয়তো নিয়তি এই ঋতুকেই বেছে নিয়েছিল তাঁর অমৃতলোকে যাত্রার দিন হিসেবে।


শান্তিনিকেতন ও বৃক্ষরোপণ উৎসব

রবীন্দ্রনাথ শুধু কবি নন, ছিলেন একজন দূরদর্শী শিক্ষাবিদও। ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন শান্তিনিকেতন, যেখানে শিক্ষার সঙ্গে প্রকৃতির স্নেহময় বন্ধন গড়ে ওঠে। এখানেই তিনি সূচনা করেন বৃক্ষরোপণ উৎসবের—প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও ভবিষ্যতের প্রতি দায়িত্বের এক অনন্য বার্তা হিসেবে।
১৯৪০ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর শান্তিনিকেতনে বৃক্ষরোপণ ও বর্ষামঙ্গল উৎসব হয়, যেখানে গাওয়া হয় কবির রচিত শেষ বর্ষা-সঙ্গীত—
“এসো এসো ও গো শ্যাম ছায়াঘন দিন”
এর পরের বছর, ১৯৪১-এর ৭ই আগস্ট (বাংলা ২২শে শ্রাবণ), কবি শেষবারের মতো শান্তিনিকেতনের আকাশে বিদায়ের রঙ ছড়িয়ে দিলেন।


২২শে শ্রাবণ – শ্রদ্ধা ও স্মরণ

যতটা আড়ম্বরের সঙ্গে ২৫শে বৈশাখে কবিগুরুর জন্মদিন পালন হয়, ২২শে শ্রাবণ ততটা নয়—তবুও এর আবেগ অনেক গভীর। শান্তিনিকেতন, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, কলকাতা এবং রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজিত হয় স্মরণানুষ্ঠান।
বিশ্বভারতীর ছাত্র-শিক্ষক, দেশ-বিদেশের রবীন্দ্রপ্রেমী, সাংস্কৃতিক সংগঠন—সবার মিলিত কণ্ঠে এই দিন ভেসে ওঠে রবীন্দ্রসংগীতে। শান্তিনিকেতনে কবি তর্পণ, বৃক্ষরোপণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে ২২শে শ্রাবণ হয়ে ওঠে শ্রদ্ধার উৎসব।


কবির দৃষ্টি – জীবন ও মৃত্যু

রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুকে ভয় পাননি। তাঁর কাছে মৃত্যু ছিল জীবনেরই আরেকটি পূর্ণতা। তিনি বলেছেন—
“মৃত্যুতেই জীবনের সর্বোচ্চ পরিপূর্ণতা”
তাই হয়তো বিদায়ের মুহূর্তকেও তিনি পরিহাসের হাসি দিয়ে গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন—
“আমরা দোঁহে ঘেঁষাঘেঁষি
চিরকালের প্রতিবেশী,
বন্ধুভাবে কণ্ঠে সে মোর জড়ায়ে দেবে বাহুপাশ,
বিদায়কালে অদৃষ্টেরে করে যাব পরিহাস।”


বাঙালির চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ

সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা, শিক্ষা, সমাজসংস্কার—যেখানেই স্পর্শ করেছেন, রবীন্দ্রনাথ সেখানে রেখে গেছেন অমোঘ ছাপ। তাঁর রচনার ভেতরে বাঙালির আত্মা, প্রকৃতিপ্রেম, মানবতা, প্রেম-বিরহ, স্বাধীনতার আহ্বান—সবই মিশে আছে। আজও তাঁর গান, কবিতা ও ভাবনা বাঙালির হৃদয়ে জীবন্ত।


২২শে শ্রাবণ শুধুই একটি তারিখ নয়—এটি বাঙালির সংস্কৃতিতে এক চিরন্তন বিরহের প্রতীক। বৃষ্টিভেজা সকাল, শান্তিনিকেতনের সবুজ প্রান্তর, রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরে মিশে যায় কবিগুরুর বিদায়ের স্মৃতি। আর আমরা, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, বহন করে চলেছি তাঁর রেখে যাওয়া আলো—যা কখনও নিভবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *