শিল্প যে মানুষের আত্মার ভাষা—এই বিশ্বাস থেকেই শান্তিনিকেতনের বিদ্যাধরপুর গ্রামে গড়ে উঠেছে স্টুডিও মৃত্তিকা। আশিস ঘোষ এবং অরুণিমা দত্ত ঘোষের প্রচেষ্টায় ২০০৬ সালে শুরু হওয়া এই শিল্পকেন্দ্র এখন প্রান্তিক মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে উঠেছে।
বিশ্বভারতীর শিল্প সদনের অধ্যাপক আশিস ঘোষ স্থানীয় শিল্পীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন, এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন অরুণিমা দত্ত ঘোষ। আশিসবাবু মনে করেন, বাংলার গ্রামের অনেক অসাধারণ শিল্পী ন্যায্য মূল্য বা স্বীকৃতি না পেয়ে হারিয়ে যাওয়ার পথে। তাঁর মন্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে—গ্রাম বাংলার প্রতিটি শিল্পীকে সমাদৃত করা এবং তাঁদের ক্রাফটকে কেন্দ্র করে একটি সমৃদ্ধ স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করা ছিল তাঁদের প্রধান লক্ষ্য।
স্টুডিওটির গঠন সত্যিই চমকপ্রদ। সহজলভ্য উপকরণে তৈরি গ্যালারিটি যেন এক স্বপ্নের সংগ্রহশালা—মুলি বাঁশের সিলিং, মুর্শিদাবাদের নিখুঁত টালি, প্যাটেল নগরের উজ্জ্বল রং, চন্দননগরের কুয়ার রিং এবং বিভিন্ন গাছের শিকড়ের মাধ্যমে নির্মিত আলোকসজ্জার সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে একটি বিশেষ নকশা। লোহা, পিতল, কাঠ, বাঁশ এবং মাটির মাধ্যমে হাজারো শিল্পকর্ম দিয়ে সজ্জিত এই গ্যালারি দর্শকদের সম্মোহিত করতে সক্ষম।
বাংলার বৈচিত্র্যময় শিল্পকর্মের বিভিন্ন উদাহরণ তুলে ধরতে গিয়ে আশিসবাবু বলেছেন—এখানে প্রায় ৫০০ রকমের মাটির ভাঁড়, লাউয়ের খোলের তৈরি ল্যাম্পশেড, বিশাল কাঠের থালা এবং লোহা ও পিতলের নানান অলংকার সৃষ্টি হয়। এসব শিল্পকর্ম শিল্পীদের দক্ষতায় একটি নতুন আকার নেয়। ঐ সব সৃষ্টি বাজারে বিক্রি হয়, যা ফলে শিল্পীরা তাদের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য পান।
স্টুডিওর সাথে নিয়মিত ভাবে যুক্ত রয়েছেন ২০ থেকে ২৫ জন শিল্পী, এবং আরও ১৫ থেকে ২০ জন এখানে শিক্ষা নিচ্ছেন এবং কাজ করছেন। বিভিন্ন প্রান্তিক পেশার মানুষ—যেমন কামার, কুমার, পিতলের কারিগর এবং কৃষক—এখানে নিজেদের নতুন পরিচয় তৈরি করছেন। আশিসবাবু জানিয়েছেন, স্টুডিওর পরিবেশ একদম পারিবারিক।
রায়চকের গঙ্গাকুটির থেকে তাজ গ্রুপের হোটেল এবং কলকাতার ইকো পার্ক—এগুলোতে স্টুডিও মৃত্তিকার সুদৃশ্য কাজগুলো ইতোমধ্যেই বহুল প্রশংসিত হয়েছে। এই স্টুডিও গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া শিল্পকে আধুনিক রূপে তুলে ধরে বাজারজাত করার মাধ্যমে বাংলার ঐতিহ্যকে রক্ষা করছে। পাশাপাশি, এটি অনেক প্রান্তিক মানুষের জীবনে স্থায়ী স্বপ্ন ও স্বাবলম্বন অর্জনের সুযোগ নিয়ে আসছে।
এভাবেই স্টুডিও মৃত্তিকা এখন শুধু একটি গ্যালারির নাম নয়; এটি গ্রামবাংলার শিল্প ও শিল্পীদের পুনর্জাগরণের একটি উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে উঠেছে।