২০০৯ সালের ১৫ জানুয়ারি বাংলা ছবির কিংবদন্তি পরিচালক তপন সিনহা বিদায় নেন। এর ঠিক পঞ্চাশ বছর পরে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁর অমর সৃষ্টি ‘হারমোনিয়াম’ উদযাপন করবে অর্ধশতক। এই বিশেষ উপলক্ষে ছবির বাসন্তী চরিত্রে অভিনয় করা সোনালী গুপ্ত কিছু স্মৃতিচারণ করলেন। তিনি ফিরে দেখলেন তাঁর শৈশব, অভিনয়ে আসার আকস্মিক ঘটনাবলী, এবং তপন সিনহার সঙ্গে কাটানো সেই অদ্বিতীয় সময়গুলো, যেগুলোর সঙ্গে আনন্দদায়ক মুহূর্তগুলোর পাশাপাশি আজ জড়িয়ে আছে গভীর শোকবোধও।
সোনালী গুপ্ত মাত্র ছোটবেলা থেকেই সিনেমার জগতে বেড়ে উঠেছেন। তাঁর বাবা, দীনেন গুপ্ত, ছিলেন একজন খ্যাতনামা ফোটোগ্রাফার, ক্যামেরাম্যান এবং পরিচালক, আর মা কাজল গুপ্ত একজন অভিনেত্রী। ফলে, অভিনয়ে প্রবেশের আগে থেকেই তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকা, পার্শ্বচরিত্র এবং সাহিত্যিকদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। সুচিত্রা সেন, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন থেকে শুরু করে বুদ্ধদেব বসু, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়—এই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বগুলির নাম যেন তাঁর শৈশবের স্মৃতিতে পরিবারিক সদস্যদের মতো স্থান নিয়েছে।
তবুও অভিনেত্রী হওয়ার কল্পনা তাঁর ছিল না। অভিনয়ে আসাটা সম্পূর্ণ ‘অ্যাক্সিডেন্টাল’ ছিল। মাত্র ১৩ বছর বয়সে আশাপূর্ণা দেবীর উপন্যাসের ভিত্তিতে বাবার পরিচালনায় ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ সিনেমার মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু হয়। বোর্ডের পরীক্ষার কারণে কিছু সময় অভিনয় থেকে দূরে থাকার পর, তিনি তপন সিনহার ‘হারমোনিয়াম’-এর মাধ্যমে আবার ফিরেন, যা তাঁর জীবনে এক নতুন মোড় এনে দেয়।
তপন সিন্হার সহকারী পরিচালক বলাই সেনের হাত ধরে ‘হারমোনিয়াম’ ছবিতে ডাক পান সোনালী। ছবির তিনটি সমান্তরাল গল্পের একটি চরিত্রে তিনি অভিনয় করছেন—বাসন্তী। প্রথমবার সাক্ষাতের পরই তপন সিন্হার কোমল ব্যবহার তাঁর সব ভয় ভেঙে দেয়। “আই লাইক ইয়োর কনফিডেন্স”—এই বক্তব্যটি যেন তাঁর অভিনয়ের আত্মবিশ্বাসে নতুন প্রাণ গেড়ে দেয়।
‘হারমোনিয়াম’ ছবির শুটিং শান্তিনিকেতনে শুরু হয়েছিল কনকনে জানুয়ারির ঠান্ডায়। প্রকৃতির মাঝে ‘এমন করেই চলতে পারি’ গানটি দিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। তপন সিন্হার রিহার্সালপ্রিয়তা, শৃঙ্খলা এবং শিল্পীর প্রতি আস্থা সোনালীর অভিনয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ইউনিটের সঙ্গে কাটানো প্রতিদিন ছিল গান, আড্ডা, তাস এবং গল্পে ভরপুর। সন্ধ্যাবেলায় তপন সিন্হার ঘরে বজায় থাকত সাংস্কৃতিক মজলিশ, যেখানে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, ভীষ্ম গুহঠাকুরতা সহ অনেকে অংশ নিতেন। রাতের সময় শমিত ভঞ্জের হারমোনিয়াম এবং রবীন্দ্রসংগীতের সুরে চারপাশটা ভরে উঠত।
ছবিতে সোনালীর পিতামাতা হিসেবে পর্দায় উপস্থিত ছিলেন কালী ব্যানার্জী ও গীতা রায়। শ্বশুর ও শাশুড়ির চরিত্রে অভিনয় করেন সন্তোষ দত্ত ও কাজল গুপ্ত। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাবলীল অভিনয় আজও সবার মনে জীবন্ত। শুটিংয়ের মাঝখানে সন্তোষ দত্তের বলা অপরাধের গল্প এবং কালী ব্যানার্জীর পরিবারের আন্তরিকতা—এসব মিলিয়ে ‘হারমোনিয়াম’ ছিল নিছক একটি চলচ্চিত্রের চেয়ে অনেক বেশি; এটি যেন এক পারিবারিক সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি।
ছবি মুক্তির পর প্রথমদিকে খুব বেশি সাড়া না পেলেও, মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে সবাইয়ের মনোযোগ আকর্ষণ করতে শুরু করে। সোনালী গুপ্ত পান এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জন্য ‘গোল্ডেন ক্রাউন অ্যাওয়ার্ড’, আর তপন সিন্হা অর্জন করেন সংগীতের জন্য ‘সিলভার ক্রাউন অ্যাওয়ার্ড’। দর্শকদের ভিড়ে সিনেমা হল মুখরিত হয়ে ওঠে এবং সোনালীর জীবনও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
তবে, অন্তরে একটি হতাশার বোধ রয়ে যায়। শান্তিনিকেতন থেকে ফেরার সময় জয়দেবের মেলায় ‘মন বলে আমি মনের কথা’ গানের শুটিংয়ে যেতে পারেননি তিনি মায়ের আপত্তির কারণে। মায়ের এই উদ্বেগ ছিল যেন মেয়ের ক্যারিয়ারে কোনো ধরনের ভূল পা না পড়ে।
আজ, ৫০ বছর পর, সোনালী গুপ্তের মনে পড়ে শান্তিনিকেতনের সেই দৌড়ানো দিনগুলোর কথা, যেখানে তাঁকে শাসন করেছেন বলাই সেন, তপন সিন্হার স্নেহময় আচরণ এবং সহশিল্পীদের হাসির গান। পুরনো হারমোনিয়ামের ডালা খুললে যেন সেই হাসি-ঠাট্টার সঙ্গে বিষণ্ণতা হাজির হয়। অনেকেই আর আমাদের মাঝে নেই—তপন সিন্হাও এর মধ্যে একটি।
স্মৃতির এই লেখার মাধ্যমে, সোনালী গুপ্ত তাঁর শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন একটি মহান পরিচালকের প্রতি, যিনি না শুধু চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন, বরং মানুষের মনে অমর সুর সৃষ্টি করেছেন।