ভাঙাচোরা মঞ্চে বেঁচে থাকা স্মৃতি: সারকারিনা ও হারিয়ে যেতে বসা বাংলা থিয়েটার

কলকাতার আধুনিকায়নের প্রভাবে ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে বিশ শতকের ঐতিহ্যবাহী বাংলা থিয়েটারের সংস্কৃতি। আকাশছোঁয়া ফ্ল্যাট, শপিং মল ও মাল্টিপ্লেক্সের আবির্ভাবের মধ্যেও প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে উত্তর কলকাতার একসময় উজ্জ্বল ‘থিয়েটার পাড়া’। এই ইতিহাসের চিহ্ন হিসেবে বেঁচে আছে সারকারিনা থিয়েটার, যা এখনো আমাদের ঐতিহ্যের একটি জীবন্ত উদাহরণ।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোডের পাশে অবস্থিত রাজা রাজকৃষ্ণ স্ট্রিটে অবস্থিত সারকারিনা বাংলা তথা এশিয়ার নাট্যজগতের একটি ব্যতিক্রমী অনুপ্রেরণা। তার গোলাকার রিভলভিং মঞ্চ এবং হাইড্রোলিক প্রযুক্তির সাহায্যে ওঠানামা করা স্টেজ, পাশাপাশি চারদিকে বসা দর্শকদের সমাবেশ—এই অভিনব মঞ্চের নকশাই সারকারিনাকে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে।
পদার্থবিদ্যা শিক্ষক এবং নাট্যকর্মী অমর ঘোষের স্বপ্ন ও উদ্যোগের ফলস্বরূপ ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই থিয়েটার। ‘তুষার যুগ আসছে’ এবং ‘সম্রাট ও সুন্দরী’ এর মতো প্রতিবেদনগুলোর মাধ্যমে এখানে কম হয়নি জনপ্রিয়তা; উৎপল দত্ত থেকে সাবিত্রী চ্যাটার্জির মতো বহু কিংবদন্তি এখানে পদার্পণ করেছিলেন। হিন্দি, ইংরেজি এবং এস্পেরান্তো ভাষায় ডাবিংয়ের ব্যবস্থা এবং জোড়া মঞ্চের ধারণার মাধ্যমে এই থিয়েটার ‘প্যান ইন্ডিয়া’ সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
কিন্তু আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে পেশাদার থিয়েটারে মন্দা সারকারিনাকেও আক্রমণ করে। সবকিছু বিক্রি করেও অমর ঘোষ থিয়েটারকে বাঁচাতে সক্ষম হননি। ২০০৮ সালে শেষ প্রযোজনার পরবর্তীতে সারকারিনা এখন অন্ধকারের মাঝে, এক ভাঙাচোরা স্মৃতিস্তম্ভে পরিণত হয়েছে—যেখানে ধুলো জমে রয়েছে চেয়ারগুলো, মরচে পড়া সিঁড়ি, এবং নীরবতার মধ্যে আটকে আছে এক গৌরবময় অতীত।
সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া বাংলা সিনেমা ‘মায়ানগর’ আবারও সারকারিনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। বাস্তব জীবনের এক চরিত্র থেকে অনুপ্রাণিত বুবু চরিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্রটিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে থিয়েটারের অন্তরালে থাকা হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো।
ঝড়-জলের প্রবল আটাঁর মধ্যেও শক্তপোক্তভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে সারকারিনা। তবে প্রশ্ন উঠে আসে—এ অবস্থায় এটি আর কতদিন টিকতে পারবে? প্রতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ও সংস্কারের অভাবের কারণে কি বাংলা থিয়েটারের এই গৌরব একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে? নাকি আবার নতুন দিনের আলোয় ভরে উঠবে থিয়েটার পাড়া, পেশাদার বাংলা থিয়েটারের প্রাণহীনতা পুনরুজ্জীবিত হবে—এই প্রত্যাশাতেই আজও দিনগুনছে সারকারিনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *