আড়ালের মুখোশ: হারিয়ে যেতে বসা গোমিরার লড়াই

উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের গ্রামবাংলায় উদ্ভব হওয়া গোমিরা নাচ পশ্চিমবঙ্গের একটি প্রাচীন লোকসংস্কৃতির নিদর্শন। প্রায় দেড়শো বছরেরও বেশি পুরনো এই মুখোশনৃত্য গ্রামীণ আস্থার ধর্মীয় আচার-প্রক্রিয়ায় নিবিড়ভাবে জড়িত। কৃষি মৌসুমের শুরুতে অশুভ শক্তির উৎকৃষ্ট দূরীকরণের উদ্দেশ্যে দেবতার আশীর্বাদ অর্জন করাই এর মূল লক্ষ্য। গামারি কাঠে খোদাই করা রঙিন মুখোশ—যেমন মহিষাসুর, নরসিংহ, কালী, এবং বুড়া-বুড়ি (শিব-পার্বতী)—এই নৃত্যের বিশেষ আকর্ষণ। ঢোল ও কাঁসির তালে মুখোশধারী শিল্পীরা অদ্ভুত আবেশে দেবতার রূপ ধারণ করেন, যা প্রচলিত বিশ্বাস।
গোমিরা কেবল একটি সাংস্কৃতিক শিল্প হিসেবেই পরিচিত নয়, এর সাথে সংশ্লিষ্ট বহু পরিবারের জীবিকা সংরক্ষণ করতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ দিনাজপুরের কুশমন্ডির কারিগররা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কাঠের মুখোশ তৈরির পেশার সঙ্গে যুক্ত আছেন। যদিও ২০১৮ সালে এই মুখোশ পেয়েছে GI (জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেটর) স্বীকৃতি, তবুও শিল্পীদের জন্য আর্থিক অনিশ্চয়তা কাটেনি। বর্তমানে গোমিরা কার্যত একটি মৌসুমি শিল্প হয়ে উঠেছে, যেখানে পৌষ, চৈত্রের গাজন-চড়ক এবং দুর্গাপুজোয় এর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বছরের বাকি সময়ের বেশিরভাগ সময় শিল্পীরা কৃষিকাজ অথবা অন্যান্য অস্থায়ী কর্মের ওপর নির্ভরশীল। পরিবেশনার দীর্ঘ সময়ের পরিবর্তে, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই এটি শুধুমাত্র ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে, আর এর ফলে তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
এক সময় বিস্তৃত এলাকায় জনপ্রিয় ছিল গোমিরা, কিন্তু বর্তমানে এটি কেবল কুশমন্ডির কয়েকটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সরকারি অনুষ্ঠানগুলো বা বিশেষ আমন্ত্রণ ছাড়া বড় মঞ্চে পারফর্ম করার সুযোগ নেই। এর ফলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প প্রকৃতপক্ষে টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে, ২০২৫ সালের দুর্গাপুজোয় ভবানীপুর মুক্তদল তাদের ৭৭তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘আড়ালে’ থিম নিয়ে গোমিরা ও কুশমন্ডির মুখোশশিল্পকে শহুরে দর্শকদের সামনে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছিল। এই উদ্যোগ গ্রাম এবং শহরের মধ্যে সাংস্কৃতিক দূরত্ব হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধির পাশাপাশি, পর্যটনের সঙ্গে যুক্তকরণ, বিদ্যালয় পর্যায়ে কর্মশালার আয়োজন এবং ডিজিটাল প্রচারের ব্যবহার গোমিরাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারে।
ঐতিহ্যের আবরণে লুকিয়ে থাকা গোমিরা আজও বেঁচে থাকতে চায়—এর জন্য প্রয়োজন সচেতনতা, সংরক্ষণ এবং সার্বিক সহযোগিতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *