বীরভূমের রাঙাবাঁধে সাঁওতাল দেওয়ালচিত্রের সংকট

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার ইলামবাজার থানার চৌপাহাড়ি জঙ্গল সংলগ্ন সাঁওতাল গ্রাম রাঙাবাঁধে এখনও বিরাজ করছে একটি প্রাচীন শিল্পের ঐতিহ্য—মাটির দেওয়ালচিত্র। এখানে মাটির তৈরি বাড়ি, খড়ের ছাউনি আর শান্ত উঠোনকে ঘিরে সাঁওতাল নারীদের দক্ষ হাতে অঙ্কিত হচ্ছে রঙ-বেরঙের নকশা, আলপনা ও রিলিফ ম্যুরাল। স্থানীয় লালমাটি, গুটি-নীল, গোবর, খড় ও পাতা-পোড়া ছাইয়ের ব্যবহার করে নির্মিত এই শিল্পকর্মে প্রতিফলিত হচ্ছে নানা প্রকৃতির চিত্র, যেমন গাছ, ফুল, ময়ূর, হাতি এবং বহু জ্যামিতিক নকশা।
বর্ষার পর ‘দাঁসাই’ এবং ধান কাটার পর ‘সোহরাই’ উৎসবের অভিজ্ঞানেই মাটির বাড়ির মেরামত ও অলংকরণের কাজ বেশ জোরদার হয়। গ্রামের পরধায় অবস্থিত ‘জাহের থান’-এ অনুষ্ঠিত বিভিন্ন ধর্মীয় আচার এবং উৎসবের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঘরবাড়ি সুন্দরভাবে সাজানো হয়। দেওয়ালে গাঢ় রঙের ‘পাড়’ টেনে, তার উপরে ব্যবহৃত হয় নানান নকশা; এবং বিস্তৃত ফাঁকা জায়গা এই শিল্পের নিছক সৌন্দর্যকে আরও উজ্জ্বল করে তুলে।
বর্তমানে এই ঐতিহ্য একটি সংকটের মুখোমুখি। নতুন প্রজন্মের উদ্বেগ এবং সরকারি আবাসন প্রকল্পের আওতায় কংক্রিটের বাড়ির প্রাধান্য মাটির বাড়ি নির্মাণের পরিমাণকে ক্রমাগত কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে দেওয়ালচিত্রের জন্য নির্ধারিত স্থানটিও হারাচ্ছে। স্থানীয় শিল্পীরা বলছেন, মাটির বাড়ি ছাড়া এই শিল্পের টিকিয়ে থাকা কার্যকরীভাবে অসম্ভব।
গ্রামের এক বাসিন্দার মন্তব্য, “আমাদের একটি মাটির বাড়ি অবশ্যই থাকা উচিত।” বিশ্ব উষ্ণায়ন ও আধুনিকতার চাপের মাঝে এই প্রাচীন জৈব শিল্পধারা কতদূর টিকে থাকবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *