ফাগুনের পূর্ণিমায় দোলযাত্রা—এটি ভারতের একটি প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময় উৎসব। এই বিশেষ দিন ধর্ম, পুরাণ, সংস্কৃতি এবং সামাজিক সম্পর্কের মেলবন্ধনে রঙের উদ্দীপনায় ভরে উঠে চারপাশ। শাস্ত্রীয় গ্রন্থে ‘ফাল্গুনিকী’ নামেও পরিচিত এই উৎসবকে মানসিক আনন্দের জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। বসন্তের রঙে মাখামাখি হয়ে ওঠে মানুষের সম্পর্ক, যেখানে আলিঙ্গন ও প্রণামের মাধ্যমে মিলনের বার্তা পৌঁছে দেয়।
তবে, রঙের এই আনন্দের আড়ালে প্রতি বছর অন্য একটি বাস্তবতার উদয় ঘটে। ‘বুরা না মানো হোলি হ্যায়’ স্লোগানের অন্তরালে অনিচ্ছাকৃত স্পর্শ, অশালীন আচরণ এবং সম্মতি ছাড়া শরীরী আগ্রাসনের অভিযোগ দেশের বিভিন্ন স্থলে সামনে আসে। আইন অনুযায়ী এই ধরনের আচরণ শাস্তিযোগ্য হলেও, অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরনের ঘটনা সংঘটিত হয়।
ঐতিহাসিকদের মতে, বাংলার দোল উৎসবের উত্স হচ্ছে প্রাচীন মদনোৎসব। ঔপনিবেশিক যুগের কলকাতার নথিপত্রেও এই উৎসবের রঙিন উদ্দীপনা, আনন্দময় শোভাযাত্রা এবং এমনকি অশ্রাব্য গানগুলোর অন্তর্ভুক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। গবেষকরা এর সাথে ‘হিন্দু স্যাটারনালিয়া’র তূলনা করেন, যেখানে ছিল অবারিত মজাঝরা। যদিও সময়ের সাথে উৎসবটির চেহারা পরিবর্তিত হয়েছে, তবুও রঙের উন্মাদনা এখনও অনুরূপ আকারে বজায় রয়েছে।
বর্তমান শহরমুখী প্রেক্ষাপটে দোল বা হোলি কেবল আবির ও গুলালের উৎসব নয়; এটি নিরাপত্তা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়গুলো থেকেও মিলে যায়। পাড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস—সব স্থানে এখন সচেতনতার প্রয়োজনীয়তার দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সুস্থ গণতন্ত্রের বিশেষত্ব হল উৎসবে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, তবে এটি জোরপূর্বক হওয়া উচিত নয়। বসন্তোৎসব, রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার উদযাপন, ন্যাড়া পোড়ানো বা রবীন্দ্রনাথের আবির-অনুষ্ঠান—এসবই প্রাসঙ্গিক বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূল অংশ। এই ঐতিহ্যকে বজায় রেখে রঙের আনন্দকে মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ রাখা এখন একটি উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রঙ যেন সম্প্রীতির প্রতীক হয়, অরাজকতার অজুহাত নয়—এটি দোলের প্রাক্কালে বিভিন্ন মহল থেকে উত্থাপিত বার্তা।