যাত্রার ‘রানী’ চপল ভাদূড়ী মঞ্চে কিংবদন্তি, জীবনে একাকীত্বের গল্প

বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্পে এক সময় পুরুষ শিল্পীরাই নারীর ভূমিকায় অভিনয় করতেন। তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য নাম হলো চপল ভাদূড়ী, যাকে অনেকেই চেনে ‘চপল রানী’ নামে।
১৯৫০-এর দশকে মাত্র ১৬ বছর বয়সে যাত্রামঞ্চে প্রবেশ করেন চপল ভাদূড়ী। তাঁর কোমল গায়ন, অভিব্যক্তি এবং নিখুঁত নারীত্বের উপস্থাপনই তাকে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জনে সহায়তা করেছিল। রানী, দেবী, বাঈজী এবং পতিতালয়ের মালকিন—এই সকল চরিত্রে তিনি ছিলেন পূর্ণাঙ্গভাবে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তাঁর অভিনয়ে প্রতিফলিত হত আন্তরিক আবেগ, এবং সাজসজ্জায়ও তিনি বিশেষ যত্ন নিতেন।সেই সময়ে তাঁর অভিনয়ে মন্ত্রমুগ্ধ ছিলেন অনেকেই। এমনকি দর্শকদের মধ্য দিয়ে ভালোবাসার প্রস্তাবও আসত প্রচুর।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সমাজ এবং বিনোদনের রুচি বদলে যেতে থাকে। যাত্রায় নারীদের প্রবেশের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পুরুষদের নারীমুখী চরিত্রে অভিনয়ের চাহিদা কমতে শুরু করে। এই পরিবর্তনের ফলে ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে চপল ভাদূড়ীর অভিনয় জীবন। এমনকি এক পর্যায়ে তাঁকে মঞ্চে অপমানের শিকারও হতে হয়।
অভিনয় ছাড়াও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত জটিল। সামাজিক সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি কখনোই প্রকাশ্যে তার ব্যক্তিগত সত্তা সম্পর্কে খোলাখুলি আলোচনা করেননি। তবুও, দীর্ঘ তিন দশকের একটি সম্পর্ক ছিল তাঁর জীবনে, যা সমাজের দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক মনে হলেও তাঁর জন্য ছিল গভীর আবেগের বাঁধন।
সময় যত গড়িয়েছে, অনেক ‘পুরুষ রানী’ দারিদ্র্যের অন্ধকারে হারিয়ে গেছেন। চপল ভাদূড়ীও বিভিন্ন ছোট খাটো কাজ যেমন মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তবে, পরবর্তীতে আবারও নানান চলচ্চিত্র এবং তাঁর বিষয় তথ্যচিত্র ও বইয়ের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে নব রূপে পরিচিতি পান এবং ভারতের LGBTQ ইতিহাসে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হয়ে ওঠেন। কিন্তু তিনি সেই পরিচিতিতে পরিচিত হতে অসম্মতি জানান।কারণ, তিনি কখনোই নিজেকে একটি বিশেষ পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি।
আজ জীবনের অন্তিম পর্বে পৌঁছেছেন তিনি, নানা শারীরিক সমস্যা এখন সঙ্গ তাঁর এবং বর্তমানে একটি বৃদ্ধাশ্রমে দিন কাটাচ্ছেন। তবু সময়ের স্রোত থেমে যায়নি—তার সঙ্গী হয়ে আছে শুধু স্মৃতির অমলিন ভাণ্ডার এবং এক উজ্জ্বল শিল্পজীবনের স্থায়ী উত্তরাধিকার, যা তাঁকে আজও অর্থবহ করে রেখেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *