৬ দিনে ১০০ উদ্ধার, নেপালের আকাশে ‘আশার পাইলট’ প্রিয়া

নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানের পর ধ্বংসস্তূপের ভেতর জীবনশক্তির চিহ্ন খুঁজে বেড়াচ্ছেন প্রিয়া অধিকারী। গত ছয় দিনে প্রায় ১০০টি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে তিনি নেপালের প্রথম মহিলা হেলিকপ্টার ক্যাপ্টেন হিসেবে বিপর্যন্ত মানুষের কাছে আশা হিসেবে উঠেছেন।

২৬শে অগস্ট হিমবাহ ধসের পরে নেপাল-চীন সীমান্তের এলাকায় আকস্মিকভাবে প্রবল হড়পা বান শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যে কাদার স্রোত সবকিছু ভেসে নিয়ে যায়—বাড়ি, রাস্তা, সেতু এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো। রাসুয়া জেলার তিমুরসহ অন্যান্য দুর্গম স্থানগুলোতে বহু মানুষ আটকে পড়েন। তাদের উদ্ধারের জন্য নেপালের বিমান বাহিনীর সঙ্গে সাথে বেসরকারি হেলিকপ্টারগুলোও পাঠানো হয়, এবং এই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন প্রিয়া।

৪০ বছর বয়সী এই পাইলটের জন্য প্রতিটি উড়ান বর্তমানে জীবন-মৃত্যুর সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। আকাশ থেকে ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে, তিনি যখন কোথাও মানুষের সাক্ষাত পান, তখন বারবার তিনি হেলিকপ্টার ফিরিয়ে আনেন। কিছু স্থানে অবতরণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই, আবার কোথাও কাদার অতিরিক্ত স্তরের কারণে হেলিকপ্টার নামানোর কাজটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও, উদ্ধার কাজ চালাতে গিয়ে তিনি অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন।

সিএনএন-কে দেওয়া তার সাক্ষাৎকারে প্রিয়া জানিয়েছেন, তিমুরে এসে ধ্বংসের দৃশ্য দেখে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলেন, “এখানে যেন সবকিছু ফুরিয়ে গেছে—জীবন, ঘরবাড়ি, এমনকি একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও।” তবে ধ্বংসস্তূপের মাঝে হাত নাড়তে থাকা কাউকে দেখলেই তিনি আবারও শক্তি ফিরে পান।

হেলিকপ্টার থেকে উদ্ধারের কাজ চলাকালীন যাঁরা উদ্ধার হয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে বললেন, “ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আপনি বেঁচে গিয়েছেন।” এঁদের সঙ্গে তাঁর পূর্ব পরিচয় না থাকা সত্ত্বেও, মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনার অভিজ্ঞতা তাঁর মনে গভীর আবেগ জাগিয়েছে।

প্রিয়া উদ্ধার অভিযানের কঠিনতার বর্ণনা দিয়েছেন। তিমুরে এলাকায় প্রায় ২০টি হেলিকপ্টার কাজ করছে, এবং কখনও একসঙ্গে একই স্থানে পাঁচ-ছ’টি হেলিকপ্টারকে সমন্বয় করে অবতরণ করতে হচ্ছে। কাদা ও ধ্বংসস্তূপে ভরা এলাকায় অবতরণের সময় পাইলটদের রেডিওর মাধ্যমে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখতে হচ্ছে। নিরাপত্তার কারণে অনেক সময় ইঞ্জিন বন্ধ না করেই উদ্ধার কাজ চালাতে হচ্ছে।
টানা উড়ানে ক্লান্ত অনুভব করলেও পিছু হটবেন না। প্রিয়ার কথায়, উদ্ধারকারীরাও ক্লান্ত, তবে এমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য তাদের প্রস্তুত করা হয়েছে।

তবে প্রিয়ার এই সাহসী কর্মকাণ্ডের কাহিনী নতুন নয়। পরিবেশবিদ্যার উপর পড়াশোনার পর তিনি কেবিন ক্রু হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। একটি হেলিকপ্টার যাত্রা তার জীবনের দিকে নতুন দিকনির্দেশনা দেয়। পরে ফিলিপিন্সে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে পাইলট হওয়ার প্রস্তুতি নেন। ২০১৭ সালে তিনি পূর্ণকালীন হেলিকপ্টার পাইলট হিসেবে কাজে যোগ দেন।

পুরুষ প্রধান এই পেশায় শুরুতে নানা সংশয়ের সম্মুখীন হলেও প্রিয়া ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতায় সেসব বাধা অতিক্রম করেছেন। নেপালের প্রথম মহিলা হেলিকপ্টার ক্যাপ্টেন হিসেবে তিনি অধিক উচ্চস্থানে উদ্ধার অভিযানের ক্ষেত্রে বিশেষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এভারেস্টসহ হিমালয়ের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় আহত পর্বতারোহীদের উদ্ধার করার তার অসাধারণ কৃতিত্ব রয়েছে। প্রায় ৬,২০০ মিটার উচ্চতায় গিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনার অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে।

কিন্তু এবারকার বিপর্যয়ের ভয়াবহতা তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকেও ছাপিয়ে গেছে। প্রিয়ার মতে, এই বন্যা ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পের চেয়েও বড় পারমাণবিক বিপর্যয়ের রূপ নিয়েছে।

ধ্বংসস্তূপের নিচে সম্ভবত কেউ অধীর অপেক্ষায় আছেন—এই বিশ্বাস নিয়েই বারবার আকাশে চক্কর দিচ্ছেন প্রিয়া। তাঁর হেলিকপ্টারের শব্দ এখন শুধু উদ্ধার অভিযানের সংকেত নয়, বিপর্যস্ত মানুষের কাছে সেটাই হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার আশার প্রতীক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *