মহা সপ্তমী ও দেবী কালরাত্রি: নাট্যশাস্ত্রে রুদ্র রূপের নৃত্যশৈলী এবং আজকের উৎসবের রঙ

শারদীয় দুর্গাপূজার মহাসপ্তমী বাঙালির উৎসবের দিন দিনলিপিতে এক অত্যন্ত পবিত্র ও প্রধান অধ্যায়। মহাষষ্ঠীর বোধনের পর এই দিনটিতে ভোরের আলো ফুটতেই নদী বা জলাশয়ে শুরু হয় ‘নবপত্রিকা স্নান’ বা ‘কলাবউ’ পূজা, যার মাধ্যমে দেবী দুর্গার মূল পূজার সূচনা ঘটে। অন্যদিকে, দেশজুড়ে চলা নবরাত্রির সপ্তম দিনে আজ আরাধনা করা হচ্ছে মা দুর্গার সপ্তম অবতার— মা ‘কালরাত্রি’-র।

অন্ধকার ও অশুভ শক্তির বিনাশক মা কালরাত্রি
পৌরাণিক আখ্যান অনুযায়ী, শুম্ভ-নিশুম্ভ এবং রক্তবীজের মতো ভয়ংকর অসুরদের বধ করতে দেবী পার্বতী নিজের উজ্জ্বল গায়ের চামড়া ত্যাগ করে এই ঘন কৃষ্ণবর্ণের উগ্র রূপ ধারণ করেছিলেন। এলোকেশী চুল, ত্রিনয়ন থেকে নির্গত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ এবং চার হাতে খড়্গ ও লোহার কাঁটাযুক্ত অস্ত্র পরিহিত এই রূপটি আপাতদৃষ্টিতে ভীতিপ্রদ। তবে ভক্তদের সমস্ত ভয় ও নেতিবাচকতা দূর করে শুভ ফল দান করেন বলে তিনি ‘শুভঙ্করী’ নামেও সমধিক পরিচিত।

নাট্যশাস্ত্র ও ধ্রুপদী নৃত্যে কালরাত্রির আর্বিভাব
ভরত মুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’-এর আঙ্গিকে দেবী কালরাত্রির এই সংহারী ও শক্তিশালী রূপটিকে ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যে (যেমন ভরতনাট্যম, ওড়িশি, কত্থক ও গৌড়ীয় নৃত্য) অত্যন্ত নান্দনিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়:

দেবীর অসুর দলনী রূপটি ফুটিয়ে তুলতে নৃত্যশিল্পীরা নবরসের অন্তর্গত ‘রৌদ্র’ (ক্রোধ) এবং ‘ভয়ানক’ (ভীতি) রসের আশ্রয় নেন।

নাট্যশাস্ত্রে বর্ণিত ‘মুষ্টি’ বা ‘ত্রিপতাকা’ মুদ্রার শক্তিশালী প্রয়োগের মাধ্যমে দেবীর হাতের খড়্গ ও অস্ত্র চালনার দৃশ্যটি মঞ্চে জীবন্ত হয়। তীব্র গতির ‘তাণ্ডব’ ঘরানার পায়ের কাজ, শরীরে অপার্থিব কম্পন এবং চোখের তীব্র চাহনির (দৃষ্টিভেদ) মাধ্যমে আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে দৈব শক্তির বিজয়ের এই মহাকাব্যিক রূপায়ণ দর্শকদের মোহিত করে।

মহা সপ্তমীর বিশেষ রঙ: ধূসর (Grey)
নবরাত্রির উৎসবের দিনপঞ্জি অনুযায়ী, এই সপ্তম দিনের জন্য নির্ধারিত বিশেষ রঙ হলো ধূসর বা গ্রে (Grey)।

  • ধূসর রঙটি দেবী কালরাত্রির ধ্বংসাত্মক অথচ শান্ত সমাহিত রূপের সাথে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি জীবনের ভারসাম্য, মানসিক স্থিরতা এবং অহংকার পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পর মনের শুদ্ধতার প্রতীক।

•উৎসবের চড়া রঙের ভিড়ে এই দিনে মণ্ডপে মণ্ডপে ধূসর রঙের সুতি বা সিল্কের শাড়ি, রুপোলি ও অক্সিডাইজড গহনা এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে ধূসর বা সিল্কের পাঞ্জাবির ফ্যাশন এক ভিন্ন মাত্রার আভিজাত্য এনে দেয়। অঞ্জলি দেওয়া এবং উৎসবের আমেজে মেতে ওঠার জন্য এই রঙটি একদিকে যেমন মার্জিত, অন্যদিকে তেমনই আধ্যাত্মিক ভাবগম্ভীর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *