কলকাতার বিখ্যাত সবুজ ও জলাভূমি রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজো আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হলে পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য গভীর ক্ষতির আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদ, প্রকৃতিপ্রেমী ও সরোবরের নিয়মিত ভ্রমণকারীরা। তাঁদের মতে, দীর্ঘকালীন আন্দোলন এবং আইনি সংগ্রামের মাধ্যমে যেই পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে, ছটপুজোর অনুমতি পুনরায় দেওয়া হলে তা আবারও বিপদের মুখে পড়তে পারে।
১৯২ একর এলাকা জুড়ে অবস্থিত রবীন্দ্র সরোবর শুধুমাত্র একটি জলাশয় নয়, বরং শহরের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সম্পদ হিসেবেও পরিচিত। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, জলজ প্রাণী এবং উদ্ভিদ বসবাস করে। পরিবেশবিদরা উদ্বিগ্ন, কারণ পুজোর ফুল, ফল ও অন্যান্য উপকরণ জলাশয়ে ফেলতে গিয়ে এবং প্রদীপের ঘি ও তেল মিশে জলদূषणের সমস্যা বাড়াতে পারে। এছাড়াও, হাজার হাজার মানুষের জমায়েত, শব্দদূষণ, এবং উচ্চস্বরে গানবাজনা সরোবরের স্বাভাবিক পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে তুলবে।
পরিবেশকর্মী সুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, রবীন্দ্র সরোবরে ছটপুজো বন্ধ করার বিষয়ে আদালতের পূর্বনির্দেশ sudah অর্ন্তভুক্ত রয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে এখানে ছটপুজোর অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তিনি প্রশ্ন করেন, আদালতের নির্দেশ কি আলোচনা করে পরিবর্তন করা যেতে পারে? তাঁর মতে, ছটপুজো পালনের জন্য রবীন্দ্র সরোবরের প্রয়োজন নেই; শহরের অন্যান্য জলাশয়েও ধর্মীয় আচার পালন সম্ভব। পরিবেশ এবং দূষণের বিষয়ে প্রশাসনকে আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সাধারণ সম্পাদক নব দত্তের মতামতও একই সুরে। তিনি জানাচ্ছেন, রবীন্দ্র সরোবর সাধারণ একটি পুকুর নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় জলাশয়, যার সংরক্ষণে কেন্দ্রীয় সরকার অর্থ বরাদ্দ করছে। জাতীয় পরিবেশ আদালত কিংবা ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালের (এনজিটি) নির্দেশনা কোনো ধর্মীয় উৎসবের বিরুদ্ধে নয়, বরং জলাশয়ের পরিবেশ, পাখিদের আবাসস্থল এবং জল মানের সুরক্ষার জন্যই জারি করা হয়েছে। যদি এই নির্দেশনা তুলে নেওয়া হয়, তবে তা একটি গুরুতর ভুল হবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
পরিবেশবিদরা দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন, ক্ষতির প্রভাব শুধুমাত্র সরোবরের জলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এখানে বসবাসকারী এবং পরিযায়ী পাখিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও বিপন্ন হতে পারে। প্রকৃতিবিদ অর্জন বসু রায় বলেন, পরিযায়ী পাখির কথা বলতে গিয়ে শুধুমাত্র জলচর পাখিগুলিই বোঝায় না; অনেক স্থলচর পাখিও শীতকালীন সময়ে শহরের সবুজ এলাকায় আশ্রয় করে। ছটপুজোর সময় এটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।জার হাজার মানুষের ভিড়, মাইক এবং উচ্চস্বরে গানবাজনার ফলে পাখিদের স্বাভাবিক বাসস্থান ও খাদ্য সংগ্রহের পরিবেশ ব্যাহত হতে পারে।
তাঁর মতামত হলো ছটপুজোর ধর্মীয় আবেগকে সম্মান জানিয়ে বিকল্প জলাশয়ের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। শহরের অন্যান্য জলাশয়গুলিকে সংস্কার করে পুজোর জন্য উপযুক্ত করে তোলার সুযোগও রয়েছে। এতে একদিকে যেমন ধর্মীয় পালন ও আচার বিনষ্ট হবে না, অন্যদিকে রবীন্দ্র সরোবরের মতো সংবেদনশীল পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।
সরোবরের নিয়মিত দর্শনার্থী হিসেবে একজন ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জন, যিনি সকালে সেখানে পাখির ছবি তোলেন, তিনিও জলদূষণ নিয়ে চিন্তিত। তিনি জানান, যদি জলাশয়ের জলে ফুল, ফল, প্রদীপের তেল ও ঘি মেশানো হয়, তাহলে এর ফলে জৈব পদার্থ এবং নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের মত পুষ্টি উপাদানের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এই উপাদানগুলিকে ভাঙার সময় ব্যাকটেরিয়া জল থেকে দ্রবীভূত অক্সিজেন গ্রহণ করে, যার ফলে জলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদানের ফলে শৈবালের বৃদ্ধিও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। জলের উপরিভাগে তেল জমতে পারে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক।র আস্তরণ তৈরি হলে অক্সিজেনের আদানপ্রদানও বাধাপ্রাপ্ত হয়। এর প্রথম প্রভাব পড়তে পারে মাছের উপর, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে গোটা খাদ্যশৃঙ্খলে।
পরিবেশবিদরা বলছেন যে, তাঁদের উদ্দেশ্য ছটপুজোর বিরোধিতা করা নয়। তাঁরা ধর্মীয় উৎসবটির গুরুত্ব এবং মানুষের আবেগকে সম্পূর্ণরূপে সম্মান করেন। তবে তাঁদের একটিই আপত্তি—রবীন্দ্র সরোবরের মতো বিশেষ প্রাকৃতিক পরিবেশে এই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা উচিত নয়।
শহরের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি উৎসবের আনন্দ বজায় রাখাও এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ রক্ষা নিয়ে চিন্তাশীল নাগরিকদের মতে, সাময়িক উৎসবের জন্য কলকাতার এই গুরুত্বপূর্ণ সবুজ সম্পদকে কোনোভাবে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত হবে না।