বর্ষীয়ান রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী অর্ঘ্য সেন জীবনাবসান করেছেন। নব্বই বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণে রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি নিবেদিত অধ্যায় নিস্তব্ধ হয়ে উঠেছে। কণ্ঠের অনমনীয়তা, গভীরতা এবং ভাবের সম্পৃক্ততায় তিনি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে মুগ্ধ করে এসেছেন। তাঁর চলে যাওয়া বাংলা সংস্কৃতি জগতের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে এনেছে।
শিল্পী অর্ঘ্য সেনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তাঁর শোকবার্তায় উল্লেখ করেন, “বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী অর্ঘ্য সেনের প্রয়াণে আমি অত্যন্ত দুঃখিত। তিনি আমাদের কাছ থেকে চলে গেলে বাংলা সংস্কৃতিতে একটি তুলনাহীন শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং শোকগ্রস্ত পরিবার ও অসংখ্য ভক্তদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।”
১৯৩৫ সালের ১১ নভেম্বর ফরিদপুর, বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেন অর্ঘ্য সেন। শৈশব থেকেই গান ও সঙ্গীতের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ গভীরভাবে গড়ে ওঠে। কৈশোরে তিনি কলকাতায় চলে আসেন এবং সেখানে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে তাঁর পড়াশোনা শুরু করেন। পরে, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনে তিনি ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট এবং ন্যাশনাল সার্ভে অর্গানাইজেশনের সাথে যুক্ত ছিলেন।
তবে পেশার আড়ালে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছিল তার সংগীত সাধনা। কিংবদন্তী দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে তালিম নেওয়া অর্ঘ্য সেনের সঙ্গীত শিল্পে তাঁর প্রভাব ছিল গভীর এবং স্পষ্ট। পঙ্কজকুমার মল্লিকের গান তাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল, এবং অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে সংগীতের শিক্ষাও গ্রহণ করেছিলেন তিনি। দেবব্রত বিশ্বাসের সংস্পর্শে এসে তাঁর রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা নতুন এক আঙ্গিকে পরিণত হয়, যেখানে আবেগের অতিরিক্ততা থেকে আলাদা হয়ে ছিলেন গভীর উপলব্ধি এবং অন্তর্মুখী ব্যাখ্যা।
অন্তরালের এ শিল্পী প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও রবীন্দ্রনাথের গানের অন্তর্নিহিত অর্থ শ্রোতার হৃদয়ে পৌঁছাতে সফল হয়েছেন। অনেকের জন্য অজানা বিষয় হলো, সংগীতের পাশাপাশি তিনি শিল্পকলার ক্ষেত্রেও অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন—বিশেষ করে সেলাইয়ের কাজের ক্ষেত্রে তার দক্ষতা ছিল বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। তিনি সংগীত ও শিল্প—দুই ক্ষেত্রেই সমানভাবে আহুল্লাসে কাজ করেছেন।
অর্ঘ্য সেনের মৃত্যুতে একটি নীরব সাধনার অধ্যায় সমাপ্ত হলো। তবে তার কণ্ঠে গাওয়া রবীন্দ্রনাথের গান এখনও জীবিত রয়েছে—একটি সংযত সৌন্দর্য ও গভীর অনুভবের চিহ্ন হয়ে।