সেলফির যুগেও বইমেলায় অটোগ্রাফের জয়যাত্রা

কলকাতা বইমেলা শুধুমাত্র নতুন বইয়ের ক্রয়বিক্রয়ের কেন্দ্র নয়, এটি একটি সময়ের যাত্রা। সন্ধ্যার মায়াবী পরিবেশে মেলার জটলায় আজও প্রিয় লেখকরা ধীরে কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপে চলে যান, আর তাঁদের পেছনে অনুসরণ করেন উচ্ছ্বসিত পাঠকরা—হাতে বই, চোখে উন্মাদনা, এবং মনে তাঁদের একমাত্র চাওয়া: একটি অটোগ্রাফ।
নবারুণ ভট্টাচার্য থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়—বইমেলার এই চারণভূমিতে আগে লেখকদের নিজস্ব রাজত্ব ছিল। কোন লেখক কোন স্টলের পাশে বসবেন, প্রিয় ঔপন্যাসিক বা কবিকে কোথায় পাওয়া যাবে—এমন তথ্য নিয়মিত পাঠকদের মুখস্থ ছিল। স্মার্টফোনের আগের যুগে স্বাক্ষর সংগ্রহ করা ছিল একটি বিশেষ ধরনের শিল্প, যেখানে পাঠক প্রয়োজন হলে দ্বিতীয় কপি বই কিনতেন শুধুমাত্র লেখকের কলমের ছোঁয়া রাখতে।
এই উন্মাদনায় লেখকরাও পিছিয়ে থাকেননি, যদিও কবিতার পাঠকরা কিছুটা লাজুক স্বভাবের। তবুও, জয় গোস্বামী, শঙ্খ ঘোষ অথবা জয়দেব বসুর সঙ্গে একবারের জন্য দেখা হয়ে গেলে তা হয়ে উঠত স্মৃতির অমূল্য রত্ন। রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও বইমেলার স্টল, আরামদায়ক সোফা ও পাঠকদের আবেগগুলি মিলে তৈরি করতো অসাধারণ মুহূর্ত—কখনও তা হাসির উদ্রেক করতো, আবার কখনও তা হাতাহাতির মতো পরিস্থিতিতে পৌঁছে যেত।
আজকের দিনে, শত মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা ও সোশ্যাল মিডিয়ার আধিপত্যের মধ্যে বইমেলা সম্ভবত একমাত্র স্থান, যেখানে সেলফির বদলে একটি বইয়ের প্রথম পাতায় বাঁকানো অক্ষরে লেখা কিছু শব্দের মূল্য অধিক। যাঁরা আর বইমেলায় আসবেন না কিংবা যাঁদের নতুন কোনো লেখা প্রকাশিত হবে না, তাঁদের স্বাক্ষরিত বইয়ের পাশে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে এক তরুণ কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এই সামঞ্জস্যই বইমেলার অন্যতম প্রধান সাফল্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *