যা ছিল শখ, তাই এখন পেশা—পারফর্মিং আর্টসে বাড়ছে পড়াশোনার সুযোগ

একদিন নাচ, গান, নাটক – ‘এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটি’ হিসাবে দেখা হত। স্কুল ও কলেজের সীমা অতিক্রম করলেই এগুলো প্রায় থেমে যেত পরীক্ষার চাপের জন্য। কিন্তু গত দুই দশকে এই ধারণাটি পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়েছে। আজকের দিনে পারফর্মিং আর্টস আর শুধুই আবেগের বিষয় নয়, বরং এটি ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত ও সম্ভাবনাময় পেশায় রূপ নিচ্ছে।
দ্বাদশ শ্রেণি পাস করার পর বিজ্ঞান, কলা বা বাণিজ্য যে কোনও বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা পারফর্মিং আর্টসে স্নাতক স্তরে পড়াশোনা শুরু করতে পারেন। রাজ্যে দীর্ঘকাল ধরে রবীন্দ্রভারতী ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃত্য, সংগীত, নাটক ইত্যাদি পারফর্মিং আর্টস বিষয়ক শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়েও এই বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যেখানে থিয়োরির পাশাপাশি সিনেমাটোগ্রাফি, পারফর্মিং টেকনোলজি এবং মিডিয়া স্টাডিজের মতো আধুনিক বিষয়গুলির উপর বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বভারতীতে ভর্তি হওয়ার জন্য কমন ইউনিভার্সিটি এন্ট্রান্স টেস্ট (CUET) পাস করা প্রয়োজন। এই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি স্বতন্ত্র প্রবেশিকা পরীক্ষাও আয়োজন করে, এবং কোর্সের সময় ইন্টার্নশিপ নেওয়া বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে, রবীন্দ্রভারতীতে ভর্তি হওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রবেশিকা পরীক্ষার মাধ্যমে ছাত্রদের নির্বাচন করা হয়, যেখানে প্র্যাক্টিক্যাল প্রশিক্ষণ ও তাত্ত্বিক শিক্ষার গুরুত্ব সমানভাবে রক্ষিত হয়।

এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো সর্বভারতীয় সঙ্গীত ও সংস্কৃতি পরিষদ। কলকাতায় ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক পরীক্ষা বোর্ড নয়, বরং একটি স্বীকৃত সাংস্কৃতিক মূল্যায়ন সংস্থা হিসাবেও পরিচিত। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজা মানসিং তোমার ইউনিভার্সিটি অফ মিউজিক অ্যান্ড আর্টস, এবং ইন্দিরা কলা সঙ্গীত বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একাধিক প্রতিষ্ঠানে এর শংসাপত্রকে সমান গুরুত্বপূর্ণ ও মান্যতা প্রদান করা হয়। বর্তমানে এটি সরকারি করপোরেশন হেরিটেজ বোর্ডের আওতায় রয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সহায়তায় এক নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অ্যাডামাস বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় নতুন কোর্স হিসেবে D.Fine ও D.Mus চালু করা হয়েছে। এছাড়া, এই সংস্থা কর্মশালা, নৃত্যোৎসব, শিল্প প্রদর্শনী এবং পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে পারফর্মিং আর্টসকে আরো জনপ্রিয় করে তুলছে এবং ছড়িয়ে দিচ্ছে তা সবার কাছে। এটা ছাড়াও, এই প্রতিষ্ঠানের শংসাপত্র নানান সরকারি-বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও যোগ্যতাসম্পন্ন এবং এই শংসাপত্রের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক কোটার সাহায্যে বহু প্রাক্তন শিক্ষার্থী সরকারি চাকরিতে আবেদন করেছে এবং অনেকেই বর্তমানে রেলওয়ে, ট্যাক্সসহ বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত রয়েছে।
পড়াশোনা শেষে পেশাগত সুযোগগুলো ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছে। NET অথবা SET পরীক্ষায় সফল হলে অধ্যাপনার সুযোগ লাভ করা সম্ভব। পাশাপাশি গণমাধ্যম, চলচ্চিত্র, ইভেন্ট ব্যবস্থাপনা, পারফর্মিং আর্টস ব্যবস্থাপনা, কনটেন্ট তৈরি এবং শিল্প পরিচালনার মত বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। যদিও নির্দিষ্ট বেতনের কর্পোরেট চাকরির সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম, তবুও থিয়েটার দল, স্বাধীন শিল্পী, মেকআপ শিল্পী কিংবা গবেষক হিসেবে দেশ এবং বিদেশে কাজ করার অনন্য সুযোগ রয়েছে।
একসময় নাচ-গানকে যারা ‘পড়াশোনার বিরোধী’ হিসেবে দেখতেন, আজ সেই ক্ষেত্রগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে প্রেম ও বিকল্প পেশার শক্ত ভিত্তিতে পরিণত হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *