ছত্তীসগঢ়ের বস্তারের এক ছোট্ট গ্রামে, যেখানে একসময় ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছিল প্রাচীন ‘গড়ওয়াকাম’ শিল্প। এটি ইন্দাস ভ্যালি সভ্যতার সময়কার লস্ট-ওয়াক্স ব্রোঞ্জ ঢালাই পদ্ধতি, যে পদ্ধতিটি হাজার বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে রয়েছে, কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এই শিল্প প্রায় ভুলে যাওয়ার পথে চলে যাচ্ছিল। তবে সেই অন্ধকার সময়ে একজন মানুষ তাঁর অবদান ও প্রচেষ্টায় এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার কাজটি করেছেন—তিনি হলেন জয়দেব বাঘেল।
কোন্ডাগাঁওয়ের সাধারণ একটি পরিবারে জন্মানো জয়দেবের জীবন কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। দিনে ক্ষেতমজুরির কাজ, আর রাতে বাবার কাছ থেকে শিল্পের নানা দিক শেখা—এটাই ছিল তাঁর প্রতিদিনের স্নেহময় রুটিন। ছোট্ট কুঁড়েঘরের কেরোসিনের আলোর নিচে তিনি দেখতে পেতেন মোমের গলন, মাটির রূপান্তর, আর এই পরিবেশেই গড়ে উঠছিল তাঁর শিল্পী সত্তা।
খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি এই প্রাচীন কারিগরি আয়ত্ত করা শুরু করেছিলেন। ‘গড়ওয়াকাম’ শিল্পের প্রতিটি নকশা তৈরি করা একটি জটিল ১২ ধাপের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, যেখানে প্রথমে মোম দিয়ে নকশা তৈরি করা হয় এবং পরে তা গলে যায়। এরপর সেই খালি জায়গায় গলিত ধাতু ঢেলে দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় একটি অনন্য ভাস্কর্য।
জয়দেব বাঘেলের অবদানে এই শিল্পটি কেবল টিকে থাকেনি, বরং নতুন আঙ্গিকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে। তাঁর ভাস্কর্যে বস্তারের আদিবাসী সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনের গল্প যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনই তা আন্তর্জাতিক মঞ্চেও প্রশংসিত হয়েছে। প্যারিস, লন্ডন এবং টোকিওতে তাঁর শিল্পের গুণ গাওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তিনি তাঁর জ্ঞান সীমাবদ্ধ রাখেননি নিজেই। গ্রামীণ যুবকদের প্রশিক্ষিত করে তিনি একটি নতুন প্রজন্মের শিল্পী গড়ে তোলেছেন, যারা আজও এই ঐতিহ্যকে জীবন্ত রেখে চলেছে।
২০১৪ সালে জয়দেব বাঘেলের মৃত্যু ঘটলেও, তাঁর সৃষ্ট ঐতিহ্য আজও জীবন্ত রয়েছে। তাঁর হাত ধরে যে শিল্পটি নতুন প্রাণ পেয়েছিল, তা আজ অনেক মানুষের জীবিকার পথ খুলেছে এবং ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গর্বের নিদর্শন।
জয়দেব বাঘেলের কাহিনী শুধুমাত্র একজন শিল্পীর সফলতার গল্প নয়—এটি সাক্ষ্য দেয় যে একজন মানুষের অধ্যবসায় ও ভালোবাসা কিভাবে ইতিহাসকে আবার নতুন করে জীবন্ত করতে পারে।