সংগীত শুধু শখ নয়, কখনও কখনও জীবনের উদ্ধারকর্তা: সোহিনী ও তার সঙ্গীত যাত্রা

সঙ্গীত অনেকের কাছে কেবল একটি শখ বা বিনোদনের মাধ্যম। কিন্তু কিছু মানুষের জীবনে এটি হয়ে ওঠে এক জীবনদায়ী থেরাপি, এক নতুন শুরু। সোহিনী, ২২ বছর বয়সী এক মেয়ের জীবন এই কথাটিকে নতুন সংজ্ঞা দিয়েছে।
সোহিনী ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ। মাত্র চার বছরের বেশি বয়সে তিনি গান শুরু করেন, এবং আশ্চর্যজনকভাবে গানেই তিনি শিখেছেন কথা বলা। তবে তার জীবন মোটেই সহজ ছিল না। জন্মের পর থেকেই তার ডাক্তাররা নির্ণয় করেছিলেন যে সোহিনী রুবিনস্টেইন-টেইবি সিনড্রোম (Rubinstein-Taybi Syndrome) নামক একটি বিরল জেনেটিক অবস্থায় ভুগছেন। এই রোগের কারণে শারীরিকভাবে তার প্রায় ৯০% অংশ বিশেষভাবে সক্ষমতা সম্পন্ন।
রুবিনস্টেইন-টেইবি সিনড্রোম একটি জেনেটিক বিকাশজনিত অসুখ, যা শিশুদের বয়সক্রমে শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রভাব ফেলে। এতে হাতের আঙ্গুল, দাঁত, চোখের সমস্যা এবং বৃদ্ধির গতি প্রায়শই বাধাপ্রাপ্ত হয়। সোহিনীর ক্ষেত্রে এই রোগ শারীরিক সক্ষমতাকে সীমিত করলেও তার মেধা ও সৃজনশীলতায় কোনো বাঁধা আসেনি।


সংগীতই সোহিনীর জীবনের রূপান্তর। ২০১৬ সাল থেকে তিনি সংগীতে প্রফেশনালভাবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। প্রতিদিন তিনি ২–৩ ঘণ্টা ধরে অনুশীলন করেন। ইতিমধ্যেই তিনি ৩০০-এর বেশি গান শুনেছেন ও শিখেছেন। যেকোনো গান তিনি শুনলেই তা মুহূর্তের মধ্যে ধরতে সক্ষম। তার মা হরমোনিয়ামে বাজান আর তার তালে তাল মিলিয়ে সোহিনী গান গায়। গান শোনার মাধ্যমেই তিনি নিজের ভাব প্রকাশ করেন, উদ্বেগ কমান, আর মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পান।
সোহিনীর অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে—সংগীত শুধু বিনোদন নয়, এটি কখনও কখনও মানসিক থেরাপি, কখনও জীবনের চিকিৎসা। কিছু মানুষের জন্য পারফর্মিং আর্ট শুধুই শখ, আবার কারো জন্য এটি জীবন উদ্ধারকারী। সঙ্গীতের রিদম, লয় এবং সুর মানুষের মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের উপর এমন প্রভাব ফেলে যা শারীরিক ও মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করে।
ডাক্তার ও থেরাপিস্টরা অনেক ক্ষেত্রেই সঙ্গীতের মতন নানান সৃজনশীল শিল্পকলাকে থেরাপি হিসেবে পরামর্শ দেন, শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের জন্যেই। বিশেষ করে যারা জেনেটিক বা মানসিক সমস্যায় ভুগছে, তাদের জন্য এটি কোনো ওষুধের বিকল্প হতে পারে না, তবে মানসিক স্থিতিশীলতা, আত্মবিশ্বাস এবং সামাজিক যোগযোগ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।
সোহিনীর কাহিনী প্রমাণ করে, সঠিক সঙ্গীত প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত অনুশীলন কেবল দক্ষ শিল্পী গড়ে তোলে না, এটি কখনও কখনও জীবনকে পুনরায় সংজ্ঞায়িতও করে।
সোহিনীর মতো মানুষরা দেখিয়েছেন যে শিল্প ও সঙ্গীত কখনো কেবল শখ নয়, এটি হতে পারে জীবনের আশার আলো, মানসিক শান্তি এবং থেরাপি একসাথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *