প্রত্যাখ্যানকারী সুলতান

” সুলতান ফের বৈরাগী, মুসাফির, ভবঘুরে, হতচ্ছাড়া, ছন্নছাড়া। সুলতান সব পার্থিব সম্পদ ফেলে য়ায়,কিন্তু একটি সম্পদ থেকেই যায় সাথে, তা হলো সুলতানের সুলতান”।
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

সুলতান ফের বৈরাগী, বিবাগী, ভবঘুরে, অর্থাৎ এটিই প্রথম নয়,বারংবার নিজেকে এক স্থান থেকে অন্য কোথাও,কিন্তু কোথায় এবং কেন এ-ই নিজেকে প্রতিস্থাপন। সুলতান কিসের সন্ধান, কাদের কাছে সে অনুসন্ধান এবং কিসের টানে এই বৈরাগ্য। নিজেকে কখনো কারও কাছে সঁপে দেন না।পার্থিব জগতের প্রথাগত সামাজিকতার বাইরে গিয়ে নিজেকে খুঁজতে থাকে।আদিমের গন্ধ খুঁজতে থাকে,কৃষকের গায়ের লোনা ঘামের স্রোতধারায়।সুলতান আধ্যাতিকতায় খুঁজে পায় এক লিঙ্গ বিভেদ হীন সমাজ যেখানে শুধু মানুষের চলাচল।সুলতান প্রত্যক্ষ প্রত্যাখ্যানরুপী।

শেখ মোঃ সুলতান ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে অবিভক্ত ভারতের বাংলা অঞ্চলের নড়াইল নামক স্থানে মাছিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সুলতানের শৈশব শুরু হয় পরাধীন, অধনস্ত শাসনের মধ্যেই। খুবই শান্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলার মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠতে থাকে সুলতান। যেখানে কীর্তনের সুর,বাউলের সহজ জীবনবোধের কথায় সুর কানে আসে।একই সাথে দারিদ্র্যের কষাঘাতে ক্ষুদার্থ মানুষের বোবা কান্নার সুর ও ভেসে আসে।
সুলতানের পিতা ছিলেন শেখ মেসের মিয়া পেশায় ঘরামি, কিন্তু মুল পেশা ছিল কৃষি কাজ। সুলতানের মাতা ছিলেন মোছাম্মদ মেহেরুন্নেছা। সুলতান ছিলেন তাদের একমাত্র আদরের লাল মিয়া। নড়াইলে লাল মিয়ার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। বাবাকে কাজের সাহায্যের সূত্র ধরে শিশু সুলতানের সুযোগ ঘটে তৎকালীন জমিদার পরিবারের সাথে আলাপের। শৈশব থেকেই প্রতিভার সাক্ষর রাখেন অংকন শৈলীতে।যা দেখতেন তা দ্রুত অংকন করতে পারতেন,বিশেষ করে মুখচ্ছবি। সেই প্রতিভার কদর করতে একটুও ভোলেনি জমিদার পরিবার। মা হারা সুলতানকে কলকাতায় ঠায় দেন তারা।


ব্রিটিশ ভারতের প্রথম রাজধানী শহর কলকাতা। সুলতান নিজের চেষ্টায়
এবং ইতিহাসবীদ ও সমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সাহায্যে কলকাতা গভমেন্ট আর্ট কলেজে ভর্তি হলেন,এবং তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত প্রথম স্থান অধিকার করা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ না করেই ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন, উদ্দেশ্য মানুষ জীবনযাত্রা ও প্রকৃতি খুব নিবিড়ভাবে অবলোকন করা। খুব সুক্ষ ভাবে দেখলে মনে হয় সুলতান সচেতনভাবে কলোনিয়াল সিলেবাস কে প্রত্যাখ্যান করলেন। এটি কি তার প্রথম তা তো নয়, সুলতান মনে হয় শহর কলকাতা কে প্রত্যাখ্যান করলেন কিছুটা।শিল্পী মাত্রই চৈতন্য যুক্ত। রাজনীতি সচেতন, সমাজ ও ধর্মীয় সকল দিকে সজাগ দৃষ্টি তার,সুলতান ও এর বাইরে নন। সুলতান এনায়েতুল্লাহ খান মাসরিকির, খাক-সার আন্দোলনে অংশ নেন ১৯৪৩ সাথে। একই সালে চরম দুর্ভিক্ষ প্রত্যক্ষ করে বাংলার মানুষ। যা ছিল ঐ ঔপনিবেশিক রাজনীতির আরেক কূটকৌশল। সুলতান শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর লাইব্রেরীতে অধ্যায়ন করার সুযোগ লাভ করে এবং তখন পৃথিবীর নানা ভাষা, সংস্কৃতি, সম্পর্কে,এবং বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের সম্পর্কে অবগত হন।

কোন কোন মানুষ জন্মায়,জন্মের সিমানা যাদের ধরে রাখতে পারে না “- আহমদ ছফা

সুলতান সীমানা কাঁটাতার এসবের ঊর্ধ্বে চলা শিল্পী, সুলতান ছুটে চলছেন নিরুদ্দেশ যাত্রায়,কিন্তু তার রেখার গতি রয়েছে স্বাভাবিক যাত্রায়। সুলতান, দিল্লি, রাজস্থান, আগ্রা পেরিয়ে কাশ্মীর গিয়ে আদিবাসীদের জীবনযাত্রার ছবি আঁকলেন। শিল্পী তো বোহিমিয়ান ফলে পরিবর্তন অপরিহার্য। কিন্তু একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় নানা সামাজিক পরিক্রমায় শিল্পীর ক্যানভাসে ভিন্ন ভিন্ন সচেতনতা। সুলতান ১৯৪৬ সালে সিমলায় তার প্রথম চিত্র প্রদর্শনী উপস্থাপন করেন।প্রাকৃতিক দৃশ্য কাশ্মীরের সংগ্রামী মানুষের চিত্র উঠে এসেছে এই প্রদর্শনীতে, ফলে এটি জানান দেয়, সংগ্রাম করে পৃথিবীকে যারা সামনে এগিয়ে নিয়ে যায় তাদেরই একজন প্রতিনিধি তার ক্যানভাস।সুলতান ধর্মের ভিত্তিতে ব্রিটিশ রাজনীতির চরম শিকার হওয়া ভূখণ্ডকে আলাদা হতে দেখলেন।সুলতান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের লেলিহান শিখা প্রত্যক্ষ করলেন। প্রত্যক্ষ করলেন এবং মগজব্ধ করলেন। সুলতান পাকিস্থানে পা রাখলেন, সুক্ষভাবে প্রত্যক্ষ করলেন ব্রিটিশ বিদায় এবং দুটি রাষ্ট্রের জন্ম। সুলতান পাকিস্তানের সফলভাবে বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী করলেন। পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে ইউরোপ, আমেরিকা লন্ডন ভ্রমন করলেন, প্রদর্শনী করলেন পৃথিবী বিখ্যাত সব শিল্পীদের সাথে। সুলতান পৃথিবী বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বক্তব্য রাখলেন। আধুনিক চিত্রকলার সংঙ্গা এবং তার পারিপার্শ্বিকতা প্রত্যক্ষ করলেন।সুলতান পশ্চিমা রাজনীতির দম্ভ কে প্রত্যক্ষ করলেন।চারিদিকে যুদ্ধের দামামা কিভাবে শুরু হয় অবলোকন করলেন। সুলতান প্রত্যাখ্যান করলেন আধুনিক স্বীকৃতি। খুবই নিভৃতে নিজেকে গুটিয়ে ১৯৫৩ সালে ফিরে এলেন। কিন্তু এই ফিরে আসা সুলতান সেই সুলতান নয়, এটি তদন্তে বেরিয়ে এলো। সুলতান এতদিন মগজব্ধ করলেন এবং তা প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করলেন নিজের আঙ্গিকে। নিজের চিত্র ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন পার্থিব পৃথিবীর চাকচিক্যতাকে,সুলতান প্রত্যাহার করেছেন ঔপনিবেশিক বর্ণ প্রথাকে, সুলতান প্রত্যাহার করেছেন পার্থিব সুখ-শান্তিকে, যা কিনা সমাজ স্বীকৃত। সুলতান অবলোকন করেছেন আদি সমাজ গঠনের প্রক্রিয়াকে তদন্ত করেছেন সূক্ষ্ম রাজনীতি, এবং নিজ হাতে তুলে নিয়েছেন তার প্রতিকার। সুলতান স্থাপন করতে চেয়েছেন নিজের অস্তিত্বকে জানান দিতে চেয়েছেন এই সভ্যতা অন্যের দেখানো আধুনিকতা নয় তা হাজার বছরের নিজস্বতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তা কারও মুখাপেক্ষী নয়। সুলতানের প্রত্যাখ্যান প্রচলিত বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে যেখানে দেখানো হচ্ছে নারী ও পুরুষকে,আসলে তা মানুষ। সুলতান কখনো রাঁধা সাজচ্ছেন। এই রাঁধা রূপ ধারণের ভিতর দিয়ে সমাজের সংকীর্ণ চিন্তা কে খারিজ করে দিচ্ছেন। পৃথিবীতে মানুষের বসবাস আছে নারী কিংবা পুরুষের নয়। সুলতান প্রত্যাখ্যান করছেন পশ্চিমাদের দেখানো নগর সভ্যতা কে সুলতান ভিড়ে গেছেন আদিম পৃথিবীর প্রতিনিধিদের কাছে যারা উৎপাদন করেন সুলতান কৃষককে বেছে নিয়েছেন। কৃষক প্রকৃতির সন্তান প্রকৃতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সুলতান এই শক্তিকে দেখিয়েছেন পশ্চিমা আধুনিকতার বিপরীতে। পাশকাটিয়ে গেলেন লোকায়িত সংসার জীবন। প্রতিনিধি হলেন আদিম মানুষের। খারিজ করে দিলেন নারী ও পুরুষের ভেদকে।সুলতানের ক্যানভাস এক আদিম শক্তির পথকে অনুসরণ করে এই ভূভাগের মালিকদেরকে চিনিয়ে দিল,যেখানে নারী ও পুরুষ সমান অংশীদার। পশ্চিমা আধুনিক সভ্যতা যে শক্তির কাছে ম্লান হয়ে যায়। সুলতান বোহেমিয়ান এবং প্রত্যক্ষদর্শী, সবটা দেখেছেন এবং তা বর্জন ও করেছেন।

যে জমির শস্যদানার ভাগ কৃষক পায়না সেই জমির সমস্ত ফসল জ্বালিয়ে দাও – আল্লামা ইকবাল

সুলতানের ক্যানভাস রং তুলি প্রস্তুত সবকিছুকে রুখে দেওয়ার জন্য। সুলতানের ক্যানভাসে প্রথম

” বৃক্ষরোপণ করা হয় যা এই ভূখন্ডে অংশীদার করা তা জানান দেয় । সুলতানের কৃষক, কৃষাণী প্রস্তুত সকল কিছুর মোকাবেলায় সুলতান প্রত্যাখ্যান করেন থরে থরে। পশ্চিমা সংস্কৃতি, প্রত্যাখ্যান করেন পশ্চিমা ভোগবিলাস এমনকি শহুরে সোডিয়াম বাতি সুলতান ফিরে যান মাটিতে। আবিষ্কার করেন এ মাটি তার নিজের যা কিনা সূক্ষ্ম রাজনৈতিক চালে অন্যের দখলে ছিল। সুলতান অবতীর্ণ হন প্রত্যক্ষ প্রত্যাখ্যানকারী রুপে। সুলতান দখলে নেন তার নিজের অখন্ড জমিনকে যা কিনা সকল মজদুরের।

রেজাউর রহমান
চিত্র শিল্পী ও লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *