প্রতি বছর ৮ মার্চ সামনে আসে একটি পরিচিত বিতর্ক—এই দিনটিকে কেবল ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, না কি ‘আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস’ বলেও গ্রাহ্য করা হবে? এই বিতর্কের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে ইতিহাস, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপ এবং শ্রমের স্বীকৃতির প্রশ্ন।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, নারীদিবসের উৎপত্তি শ্রমজীবী নারীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। উনিশ শতকের শেষাংশ এবং বিশ শতকের শুরুতে কারখানার নারী শ্রমিকরা অনৈতিক মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং অমানবিক কাজের পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নেমে আসেন। ১৯০৮ সালে নিউ ইয়র্কে হাজারো নারী শ্রমিক ভোটাধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং কম কর্মঘণ্টার জন্য প্রার্থী হন মিছিলে। এরপরে, সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন আন্তর্জাতিক স্তরে একটি নির্দিষ্ট দিনকে শ্রমজীবী নারীদের সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে ‘শ্রমিক’ শব্দটির অর্থও প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে এটি শুধুমাত্র কারখানার শ্রমিকদের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়; কৃষিজমির শ্রমিক, চা-বাগানের কর্মী, আশাকর্মী, মিড-ডে মিল কর্মী, গৃহকর্মী, কর্পোরেট কর্মী এবং গিগ ওয়ার্কারদেরও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এমনকি যারা শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহণ বা যোগাযোগের মতো সেবামূলক ক্ষেত্রগুলোতে কাজ করেন, তারাও শ্রমজীবী।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে যায় গৃহস্থালির অদৃশ্য শ্রম সম্পর্কে। প্রতিদিন অসংখ্য নারী ঘরের কাজ, সন্তান লালন-পালন এবং পরিবারের যত্নে নিরলস পরিশ্রম করেন, তারপরও তাদের এই শ্রমের আর্থিক মূল্য বা সামাজিক স্বীকৃতি অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে। আধুনিক অর্থনীতির আলোচনায় ‘সোশ্যাল রিপ্রোডাকশন’ বা সামাজিক পুনরুৎপাদনের ধারণাটি এই অদৃশ্য শ্রমের গুরুত্বকে ফুটিয়ে তুলেছে।
তাই আজকের দিনে নারীদিবস শুধু উৎসব বা আনুষ্ঠানিকতা নয়—এটি শ্রম, অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নও বটে। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের কাজের মূল্য বোঝা—এই বার্তাই তুলে ধরে ৮ মার্চের দিনটি।
অতএব নারীদিবস মানে শুধু উদযাপন নয়, বরং নারীশ্রমের মর্যাদা ও সমান অধিকারের দাবিকে নতুন করে স্মরণ করার দিন।