ঋতুপর্ণের সিনেমায় রবীন্দ্রনাথ: সম্পর্কের অন্তরমহল থেকে ইতিহাসের দ্বন্দ্ব

বাংলা সিনেমায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব দীর্ঘকাল ধরে অনুভূত হচ্ছে। তবে নব্বইয়ের দশকের পর যখন বাংলা চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথের আলোচনা একটু কমতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ তাঁর সিনেমা এবং সৃজনশীল চিন্তায় বারবার রবীন্দ্রনাথের দিকে ফিরে গিয়েছেন। ১৯৯২ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে নির্মিত তাঁর ছবিগুলিতে, বিশেষ করে শেষ পর্যায়ে, রবীন্দ্রনাথ একটি গুরুত্বপূর্ণ সৃজনশীল উৎস হয়ে উঠেছিলেন।
‘চোখের বালি’ এবং ‘নৌকাডুবি’র মতো রবীন্দ্র-উপন্যাসের ভিত্তিতে নির্মিত চলচ্চিত্রে ঋতুপর্ণ কেবলমাত্র মূল কাহিনিকে পুনর্নির্মাণ করেননি, তিনি এগুলোকে মধ্যবিত্ত সমাজের সম্পর্ক, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, যৌনতা এবং আত্মপরিচয়ের বিষয়গুলোকে নতুনভাবে আলোচনায় এনেছেন। তাঁর চলচ্চিত্রগুলোর মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল মানুষের সম্পর্কের জটিলতা এবং সেই সম্পর্কের গভীরে লুকানো বিভিন্ন টানাপোড়েন।
বিশ্লেষকদের মতে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যেও ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে সংঘাত, সামাজিক নিবন্ধনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বগুলি শেষপ্রান্তের স্তরের উপস্থিতি রয়েছে। এই কারণেই ঋতুপর্ণ রবীন্দ্রনাথের লেখার দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন তাঁর নিজস্ব চিন্তাধারা প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে। তবে, ‘চোখের বালি’ ও ‘নৌকাডুবি’ সিনেমাতে ইতিহাস এবং রাজনীতির বিভিন্ন মাপকাঠি সংযুক্ত করার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি মাঝে মাঝে মূল সাহিত্যিক সুর থেকে সরে গেছেন, এমন সমালোচনাও রয়েছে।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমান সময়ের বাংলা সিনেমায় রবীন্দ্রনাথকে নতুনভাবে উপলব্ধির প্রয়াসে ঋতুপর্ণ ঘোষ সত্যিই একটি সাহসী কাজ করেছেন। তার লিঙ্গ, যৌনতা, সামাজিক পরিচয় ও ব্যক্তির স্বাধীনতা সংক্রান্ত অনুসন্ধানগুলি তাকে বারবার সেই রবীন্দ্রনাথের কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে গেছে, যিনি প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থার প্রতি প্রশ্ন তোলার শিল্পে আমাদের গড়ে তুলেছিলেন। এই কারণে ঋতুপর্ণের রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কাজ করাকে শুধু সাহিত্য ভিত্তিক সিনেমা নির্মাণ বলা উচিত নয়, বরং এটিকে একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক অনুসন্ধান হিসেবেই দেখা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *