একসময় রাষ্ট্রপতির হাত থেকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার গ্রহণ করে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিলেন অভিনেতা শফীক সৈয়দ। তাঁর অভিনয় মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, এবং দেশ-বিদেশের দর্শকেরা মুগ্ধ হয়েছিল তাঁর প্রতিভায়। অস্কার মনোনীত ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি আলোচনার মারফত উঠে আসেন। তবে বর্তমানে জীবিকার চাহিদায় বেঙ্গালুরুর রাস্তায় অটোরিকশা চালিয়ে তাঁর সংসার পরিচালনা করতে হচ্ছে।
১৯৮৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত পরিচালক মীরা নায়ারের একটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘সলাম বোম্বে’-তে শফীক সৈয়দ প্রধান শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেছিলেন। ওই চলচ্চিত্রে তাঁর অসাধারণ অভিনয়ের কারণে তিনি শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
শফীকের জীবন সঙ্কট ও সংগ্রামের এক দীপ্তঅনুষ্ঠানে পরিপূর্ণ। বেঙ্গালুরুর একটি বস্তিতে তাঁর বেড়ে ওঠা, পরে তিনি ঘর ছেড়ে মুম্বইতে চলে আসেন। চার্চগেট স্টেশনে দিন কাটানোর সময় পরিচালক মীরা নায়ারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এখান থেকেই তিনি ‘সলাম বোম্বে’-তে তারকা হয়ে ওঠার সুযোগ পান, যা রাতারাতি তাঁর জীবনকে পাল্টে দেয়।
তবে, এই সাফল্যের জৌলুশ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী হলেও, বলিউডে নিয়মিত কাজের সুযোগ পাননি শফীক। সংবাদে প্রকাশিত তাঁর সফলতার খবরের কাটিং নিয়ে একাধিক স্টুডিওর দরজায় কড়া নেড়েছেন, কিন্তু প্রতিবারই হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে খালি হাতে।
১৯৯৩ সালে ‘পতঙ্গ’ ছবিতে অভিনয়ের পর তাঁর অভিনয়যাত্রা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। কাজের অভাবে তিনি বেঙ্গালুরুতে ফিরে যান। পরিবারকে সমর্থন করার জন্য তিনি সংসারের খরচ জোগাতে অটো চালানো শুরু করেন। শুরুতে দৈনিক মাত্র ১৫০ টাকা আয় করে তাঁকে সংসার চালাতে হয়েছে।
অর্থের অভাবের পাশাপাশি সমাজের বিদ্রূপও তাঁকে শঙ্কিত করেছিল। এক সময় জাতীয় পুরস্কারজয়ী অভিনেতা ছিলেন, আর এখন একজন অটোচালক— এই কঠিন সত্যটি তার জন্য মেনে নেওয়া একেবারেই সহজ নয়। মানসিক অবসাদ এতটা চরমে পৌঁছেছিল যে, জীবনের প্রতি নিরাশ হয়ে তিনি দু’বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন বলে শোনা যায়।
কষ্টকর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে শফীক দায়বদ্ধতা না হারিয়ে নতুনভাবে জীবনযাপন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অটো চালানোর পাশাপাশি তিনি অতিরিক্ত আয়বর্ধনের লক্ষ্যে কন্নড় ধারাবাহিক টেলিভিশনে সহকারী ক্যামেরাম্যান হিসেবে কাজ করে চলেছেন।
শফীক সৈয়দের জীবন যেন এক নির্মম চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য। সেখানে জাতীয় পুরস্কার, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অথবা একসময়কার তারকাখ্যাতি— কিছুই জীবনের কঠোর বাস্তবতার বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারেনি। তাঁর কাহিনী এখনও মনে করিয়ে দেয় যে, সাফল্যের আলো কত দ্রুত ঝরে যেতে পারে এবং শিল্পীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।