যুক্তরাষ্ট্র ৩৬টি প্রাচীন প্রত্নবস্তু সিরিয়ার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে, যেগুলোর আনুমানিক মূল্য ৫০ লাখ ডলারেরও বেশি। ফিরতি সংগ্রহে রয়েছে প্রাচীন পালমিরার একটি বিশাল পাথরের সমাধি-ভাস্কর্য এবং রোমান যুগের ১৪টি মোজাইকসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন।
২৩ সেপ্টেম্বর এই প্রত্নবস্তুর ফেরতের খবর প্রকাশিত হয়। অবৈধভাবে প্রত্নবস্তু পাচার এবং আন্তর্জাতিক শিল্পবাজারে তাদের হাতবদল সম্পর্কিত তদন্তের অংশ হিসেবে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর এগুলো সিরিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়।
ফেরত আসা নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য হলো পালমিরার চুনাপাথরের কাজটি। এটি দ্বিতীয় শতকের শেষভাগের একটি সমাধি-ভাস্কর্য, যেখানে একজন শায়িত পুরুষের সাথে একটি নারী ও তিনটি শিশুকে দেখা যায়। এর ওজন এক হাজার পাউন্ডেরও বেশি। এটি এক সময় পালমিরার একটি সমাধি-কক্ষের উপাদান ছিল। তদন্তের ফলে জানা যায় যে, এটি সেখানে থেকে সরিয়ে দুবাইয়ের মাধ্যমে পাচার করা হয়েছিল।
এই নিদর্শনের গুরুত্ব তাই আরও বেড়ে যায়, কারণ এটি পালমিরায় ইসলামিক স্টেটের (আইএস) ধ্বংসযজ্ঞের শুরু হওয়ার আগে সরানো হয়েছিল। ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে প্রাচীন এই নগরীর প্রত্নস্থলগুলোতে ব্যাপক ধ্বংস সাধন করা হয়।
ফেরত আসা সংগ্রহে সিরিয়ার একটি রোমান ভিলা থেকে আনা ১৪টি মোজাইক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এদের মধ্যে একটি মোজাইক অংশ তৃতীয় শতক খ্রিস্টপূর্বাব্দের, যেখানে গ্রিক পুরাণের টেলেটি ও ইরোসের বিবাহের দৃশ্য চিত্রিত হয়েছে। এসব মোজাইক তৈরি করা হয়েছে অসংখ্য ক্ষুদ্র রঙিন পাথরের টুকরো, যাকে টেসেরা বলা হয়, দিয়ে।
ফেরত আসা ৩৬টি নিদর্শনের মধ্যে ১৩টি উদ্ধার করা হয়েছে নিউ ইয়র্কের The Metropolitan Museum of Art বা মেট থেকে। ম্যানহাটন ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে মেটের সংগ্রহ থেকে তদন্তের ফলস্বরূপ ৪০২টি প্রাচীন নিদর্শন জব্দ করা হয়েছে, যার সম্মিলিত মূল্য প্রায় ৯ কোটি ৮৭ লাখ ডলার।
এই সময়ে ফেরত আসা চারটি বস্তু মার্কিন সংগ্রাহক মাইকেল স্টেইনহার্টের সংগ্রহে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০২১ সালে হওয়া একটি সমঝোতার অধীনে তার সংগ্রহ থেকে প্রায় ১৮০টি প্রত্নবস্তু উদ্ধার করা হয়, যার আনুমানিক মূল্য ছিল ৭ কোটি ডলার। এই সমঝোতার ফলে ভবিষ্যতে প্রত্নবস্তু সংগ্রহের উপর তার জন্য একটি আজীবন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
তদন্তকারীদের মতে, ফেরত দেওয়া ৩১টি নিদর্শনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার নিদর্শনগুলোর লেবাননের প্রত্নবস্তু ব্যবসায়ী জর্জেস লফটির সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ২০২২ সালে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে, এবং ২০২৩ সালে ইন্টারপোল কর্তৃক রেড নোটিশ প্রকাশ করা হয়। তবে এই অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে এখনো আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
নিউইয়র্কের ম্যানহাটন ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির Antiquities Trafficking Unit এর তথ্য অনুযায়ী, তারা এখন পর্যন্ত ৬,৪০০টিরও বেশি সাংস্কৃতিক নিদর্শন উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে, যার মোট বাজারমূল্য প্রায় ৪৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এই উদ্ধারকৃত নিদর্শনগুলির মধ্যে ৪০টি দেশের জন্য ৬,২০০টির বেশি নিদর্শন ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সিরিয়ার জন্য এই নথি পুনরুদ্ধার কেবল প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের পুনঃপ্রাপ্তি নয়; এটি হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার সঙ্গে সংযুক্ত প্রায় অপরিহার্য ঐতিহাসিক নিদর্শনের পুনরাবির্ভাব ঘটাচ্ছে। বিশেষ করে, পালমিরার ভাস্কর্যটি যুদ্ধ ও ধ্বংসের সম্মুখীন হয়েও সিরিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছে, যা হারিয়ে যাওয়া থেকে বাংলার ইতিহাস রক্ষা করছে।