বাংলা, পালি, প্রাকৃতসহ পাঁচটি ধ্রুপদি ভাষার জন্য একটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র সরকার। তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগ না থাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এই দায়িত্ব দেওয়ায় শিক্ষকের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়েছে।
দেশের ধ্রুপদি ভাষাগুলোর সংরক্ষণ, গবেষণা এবং উচ্চশিক্ষার উন্নয়নে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স’ (CoE) বা উৎকর্ষ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক। বাংলা, পালি, প্রাকৃত, অসমিয়া ও মারাঠি—এই পাঁচটি ভাষার উপর ভিত্তি করে পৃথক কেন্দ্র গঠন করা হবে।
শিক্ষা মন্ত্রকের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ধ্রুপদি পালি ভাষার জন্য একটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হবে ওড়িশার কোরাপুটে অবস্থিত সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব ওড়িশায়। একইভাবে, ধ্রুপদি প্রাকৃত ভাষার কেন্দ্রের দায়িত্ব পেয়েছে সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব গুজরাট। এ ছাড়া, শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতে ধ্রুপদি বাংলা ভাষার জন্য একটি কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। ধ্রুপদি অসমিয়া ভাষার জন্য তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচিত হয়েছে, আর ধ্রুপদি মরাঠি ভাষার কেন্দ্র গঠন করবে পুনের ডেকান কলেজ পোস্টগ্র্যাজুয়েট অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট।
তবে এই বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে ইতোমধ্যে কিছু প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠছে যে, পালি ও প্রাকৃত ভাষার জন্য নির্বাচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংশ্লিষ্ট ভাষার পৃথক বিভাগ অথবা নিয়মিত কোর্স নেই।
শিক্ষাবিদদের একটি অংশের মতে, নির্দিষ্ট ভাষা নিয়ে উৎকর্ষ কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য সেই ভাষায় দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাদান, গবেষণা এবং দক্ষ শিক্ষকতার উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি। যদি সংশ্লিষ্ট বিভাগের অভাব থাকে, তবে কেন্দ্রগুলিকে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে শুরু থেকেই উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
স্থায়ী ইউজিসি সচিব আর কে চৌহান বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সাধারণত কোনও বিশেষ ভাষা বা বিষয়ভিত্তিক স্টাডি সেন্টার বা উৎকর্ষ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে সেই বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়, যেখানে ইতিমধ্যেই সেই বিষয়ে আলাদা বিভাগ বিদ্যমান। যদি ওই বিভাগ না থাকে, তবে কেন্দ্রগুলিকে দক্ষতার সাথে পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।
এক ভাষাবিদ একই মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতোমধ্যেই পালি ও প্রাকৃত ভাষার জন্য স্বতন্ত্র বিভাগ গড়ে উঠেছে, এবং দীর্ঘ সময় ধরে এই ভাষাগুলোর পাঠদান ও গবেষণার নীতিমালা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। তাই, যদি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কিছু নির্বাচন করা হয়, তাহলে গবেষণা এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আরও দ্রুত ফল লাভ করা সম্ভব হতে পারে বলে তার বিশ্বাস।
অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নির্বাচনের জন্য সরকারের কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে কিনা, সেই বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়। নতুন এই উৎকর্ষ কেন্দ্রের মাধ্যমে ধ্রুপদি ভাষার প্রাচীন সাহিত্য, ব্যাকরণ, পাণ্ডুলিপি, ভাষাবিজ্ঞান এবং ঐতিহাসিক উন্নয়ন নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ভাষাগুলির সংরক্ষণ ও প্রসারের লক্ষ্য রয়েছে, এমনটাই মনে করা হচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন ভাষাকে ধ্রুপদি ভাষার মর্যাদা দেওয়ার পর সেগুলোর গবেষণা ও চর্চাকে প্রতিষ্ঠিতভাবে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যেই এই পাঁচটি কেন্দ্র গঠন করা হয়েছে। তবে, যেসব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ভাষায় যথেষ্ট দক্ষতা ও পরিকাঠামো রয়েছে, তাদের বাদ দিয়ে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে শিক্ষামহলে এখন একটি বড় প্রশ্ন উঠেছে।