ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা অবস্থাতেও হাল না ছাড়ার উদাহরণ স্থাপন করেছেন এক ছাত্র। ফোনের ক্যামেরায় তিনি নিজের আশেপাশে ভয়াবহ পরিস্থিতি তুলে ধরে সাহায্যের আহ্বান জানান। মাত্র ১১ সেকেন্ডের এই ভিডিওটি দিল্লির সত্যনিকেতন এলাকার মারাত্মক দুর্ঘটনার একটি হৃদয়বিদারক ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দক্ষিণ দিল্লির সত্যনিকেতনে রবিবার দুইপরে একটি পুরনো পিজি ভবন আচমকা ভেঙে পড়ে। দুর্ঘটনার সময় ভবনের ভিতরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন ছাত্র উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা দ্বিতীয় বর্ষের B.Com ছাত্র আদিত্য তাঁর ফোনের মাধ্যমে ভিডিও কল করে সাহায্য চেয়ে থাকেন। ভিডিওতে তাঁকে ধুলোয় ঢাকা দেখতে পাওয়া যায়, শরীরে রক্তের দাগ ও চারপাশে কংক্রিটের টুকরো এবং বাঁকানো নির্মাণসামগ্রী ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
জাতীয় ছাত্র পরিষদ (NSUI) বিকেল সাড়ে ৫টায় সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই ভিডিওটি প্রকাশ করে। পরে উদ্ধারকারী দল আদিত্যকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। দিল্লি ফায়ার সার্ভিসের মতে, তিনি চিকিৎসকদের নজরদারিতে রয়েছেন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়নি।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় যতদূর জানা যাচ্ছে, এখন পর্যন্ত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। ১২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং আহত ১০ জনকে AIIMS ট্রমা সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নীচে অন্য কাউকে আটকে আছে কিনা, সেটা দেখতে উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে।
প্রায় ৫০ বছরের পুরাতন ওই ভবনটি, যা ‘Hostel Daze’ নামের একটি ছেলেদের পি.জি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল, একটি ৫৫ বর্গগজের প্লটে নির্মিত ছিল। রিপোর্ট অনুযায়ী, এটি G+4 কাঠামোর অধিকারী, তবুও অনুমোদন ছিল মাত্র G+1 পর্যন্ত। এই কারণে ভবনের অনুমোদন এবং নির্মাণ প্রক্রিয়া নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ভবনটি ধসে পড়ার সময় নিচের তলায় সংস্কারের কাজ চলছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, বেসমেন্টেও নির্মাণ কিংবা মেরামতির কাজ চলছিল। সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টির ফলে বেসমেন্টে জল জমে থাকার ফলে ভবনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও আশঙ্কা কমেনি। যদিও ধসের আসল কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
ঘটনার পর দিল্লি সরকার MCD-র পাঁচজন কর্মকর্তা সাসপেন্ড করেছে। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ডেপুটি কমিশনার, এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার, সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার, অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার এবং জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার।
এদিকে, ভবনের মালিক হরিরাম বনসলের বিরুদ্ধে পুলিশ FIR দায়ের করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে অনিচ্ছাকৃত মৃত্যু ঘটানো, ভবন রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা বিপন্ন করা। এই কারণে তাঁর বিরুদ্ধে লুক-আউট নোটিস জারি করা হয়েছে এবং পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তাঁকে গ্রেফতার করতে বিভিন্ন দল একাধিক স্থানে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক অনিল শর্মা জানান, ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা কিছু মানুষের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধারকাজে যুক্ত হয়েছেন। কেউ খালি হাতে, আবার কেউ স্থানীয়ভাবে পাওয়া যন্ত্র তৈরি করে ধ্বংসাবশেষ সরানোর চেষ্টা করছেন।
এই ঘটনার পর আশেপাশের ভবনগুলো সম্পর্কে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বেআইনি ভাবে চার তলা উচ্চতার বেশি নির্মিত ভবনগুলোকে অবিলম্বে সিল করার নির্দেশ দিয়েছে MCD। পাশের একটি মহিলা পিজি-ও খালি করে সিল করে দেওয়া হয়েছে।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতির অবলোকন করেন এবং ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি জানান, উদ্ধারকাজে প্রায় ৮০ শতাংশ ধ্বংসাবশেষ ইতোমধ্যে সরানো হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ধ্বংসস্তূপ থেকে মোট ১২ জন ছাত্রকে উদ্ধার করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বেঁচে থাকা আহতদের উন্নত চিকিত্সার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।। তাঁদের পরিবারের সঙ্গেও প্রশাসন নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।