কবিপক্ষে ফিরে দেখা: পাড়ার মঞ্চ থেকে বাঙালির মননে রবীন্দ্রনাথ

জীবনের খাতায় সময় ফুরিয়ে যায় এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু সত্যি হলো, সময় ফুরায় না; বরং শেষ হয়ে যায় মানুষের অস্তিত্ব ও প্রত্যাশা। কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে সময়কে অতিক্রম করে থেকে যান চিরকালীন, যা শুধুমাত্র সম্ভব একজন শিল্পীর দ্বারাই, তাঁর কাজের মাধ্যমে গল্প, গান, কবিতা অথবা চিত্রের মধ্যে দিয়ে। আর তার এক উজ্জ্বল নিদর্শন হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি আজও বাঙালির জীবনে এক অনিবার্য প্রেরণা হয়ে রয়েছেন। ১৯৪১ সালে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও, এত বছর পরেও তিনি বাঙালির মনে, সংস্কৃতিতে এবং অভ্যাসে অমর। বরং সময়ের সাথে সাথে, তাঁর রচনাগুলি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আবারো পাঠ করা হয়। এই কারণেই ৯ই মে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী অর্থাৎ রবীন্দ্রজয়ন্তী পেরিয়ে গেলেও তার উদযাপনা চলে আরও কিছু দিন আর সেই পরবর্তী সময়টিকে আজও বাঙালিরা প্রেমের সঙ্গে ‘কবিপক্ষ’ বলে উল্লেখ করে।রবি ঠাকুর তাঁর জীবৎকালে বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর রচনাগুলির স্থায়িত্বের মূল্য। এজন্যই তিনি লেখেন, “আজি হতে শতবর্ষ পরে” আর সত্যিতেই, আজকের দিনে শতবর্ষ পেরিয়ে তাঁর কবিতা, সংগীত এবং চিন্তাধারা মানুষের মনে একইভাবে উজ্জ্বলতা এনে দেয়।নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রজয়ন্তী শুধুই একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল একটি সামাজিক উৎসবের মতো। বর্তমানের মতো ডিজে-নির্ভর ধর্মীয় শোভাযাত্রার এত রমরমা তখন ছিল না। বরং মে মাস আসলে পাড়ার মোড়ে বাঁশের মঞ্চ তৈরির কাজ শুরু হতো, দিনের পর দিন চলত রিহার্সাল, মাইকে প্রচুর রবীন্দ্রসংগীত বাজত।কেউ আবৃত্তি করছে, কেউ নাচের তালে ব্যস্ত, আবার কেউ বা ‘শ্যামা’ কিংবা ‘চিত্রাঙ্গদা’র মহড়ায় মশগুল—এই সব মিলিয়ে গড়ে উঠত এক অনন্য পরিবেশ। ছোটদের জন্য এটি ছিল প্রথম মঞ্চ, প্রথম দর্শক এবং প্রথম শিল্পচর্চার অভিজ্ঞতা।তবে একটি বিশেষ বয়সের পর, এই অনুভূতির স্বরূপ পরিবর্তিত হতে থাকে। পাড়ার মাইকে বাজানো রবীন্দ্রসংগীতের আনন্দ একটু দূরে চলে যায়, আর রাতের নির্জনতায় দেবব্রত বিশ্বাস কিংবা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা শুরু হয়। তারপর সময়ের সাথে সাথে এই উপলব্ধি হতে থাকে যে, কবি রবীন্দ্রনাথের বাইরেও একটি গভীর চিন্তানশীল প্রাবন্ধিক, দার্শনিক এবং সমাজভাবুক রবীন্দ্রনাথ বিদ্যমান।আজকের সমাজে তাঁর জাতীয়তাবাদ, মানবতাবাদ এবং সমাজচিন্তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। এই ভাবনাগুলোর বীজ কিন্তু প্রথমবারের মতো বোনা হয়েছিল সেই পাড়ার ছোট মঞ্চে—‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’ কিংবা ‘আগুনের পরশমণি’ মত গানগুলোর মাধ্যমে। প্রত্যেক পরিবারের বইয়ের তাকগুলিতে গীতবিতান বা সঞ্চয়িতা স্থান পায়নি। তবে সেইসব পরিবারের ছোট শিশুরাও পাড়ার অনুষ্ঠান, পাড়াতুতো দাদা-দিদি, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সহায়তায় রবীন্দ্রনাথকে চিনতে সমর্থক হয়েছিল। এরপর প্রত্যেকে তাঁকে নিজেদের মত করে গ্রহণ করেছে।আজ কবিপক্ষ উপলক্ষে শহরের বিভিন্ন স্থানে বড় আকারের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যা বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে পালিত হয়। তবে, তবুও মনে হয়, সেই আন্তরিক এবং বাড়ির পাশে তৈরি সেই বাঁশের মঞ্চগুলোর প্রয়োজনীয়তা এখনও সবচেয়ে বেশি। কারণ শিশুমনের কোমল মাটিতে যখন কোনো শিল্পের প্রথম ছাপ পড়ে, তখন তা নিখুঁত নান্দনিকতার মাধ্যমে নয়, বরং আবেগ ও আন্তরিকতার দ্বারা গড়ে ওঠে।নব্বই দশকের সময়ের রবীন্দ্রজয়ন্তী, রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা, বিজয়া সম্মিলনী অথবা পাড়ার নৃত্যনাট্যের মহড়া—এসবই এক ধরনের যৌথ সাংস্কৃতিক স্মৃতির জন্ম দেয়। সেই স্মৃতির ভিতর দিয়েই শেখা, শত বছর আগে লেখা সাহিত্যও শতবর্ষ পরে এসে হৃদয়ের দরজা খুলে দিতে পারে।কবিপক্ষ একটি বিশেষ সময়, যা কেবল একজন কবিকে স্মরণ করার জন্যই নয়। বরং এটি বাঙালির শৈশব, সংস্কৃতি, স্মৃতি এবং মননের দিকে ফিরে যাওয়ার একটি অসাধারণ ঋতু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *