লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার মাঠে নেমে গভীর আবেগে ভাসলেন। ৩৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে এই কিংবদন্তি তার শেষ ম্যাচটিকে স্মরণীয় করে তুললেন। বুয়েনস আইরেসের ঐতিহাসিক মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা বেনিনকে ৩-০ গোলে পরাজিত করেছে। বিদায়ী ম্যাচে মেসি একটি গোলের পাশাপাশি দুটি গোলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
ম্যাচ শুরুর আগে পুরো স্টেডিয়াম মেসির প্রতি অনুরাগে ভাস্ছিল। হাজার হাজার সমর্থক গ্যালারিতে বসে বারবার চিৎকার করছিলেন—‘মেসি, মেসি!’ মাঠে উন্মুক্ত ছিল একটি বিশাল আর্জেন্টিনা জার্সি। সেখানে ১০ নম্বরের জার্সির বদলে লেখা ছিল—‘Gracias’, যার অর্থ ‘ধন্যবাদ’।
ম্যাচের দশ মিনিট পার হলে মেসির সম্মানে এক মিনিটের জন্য করতালি শুরু হয়। আতশবাজির আলোতে ভরে যায় স্টেডিয়াম। বেনিনের ফুটবলাররাও এই বিদায়ী আবেগে অংশ নেন। ম্যাচ শেষে তাঁদেরকে মেসির সঙ্গে ছবি তুলতে দেখা যায়।
এই গুরুত্বপূর্ণ রাতে মেসির পাশে ছিলেন তাঁর তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও এবং চিরো। গ্যালারিতে ছিলেন তাঁর স্ত্রী আন্তোনেলা এবং মা সেলিয়া। জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি আর্জেন্টিনা দলের কোচ লিওনেল স্কালোনি। মেসির দীর্ঘদিনের সতীর্থ এবং গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেসের চুলেও বিশেষ ‘M’ চিহ্ন ছিল।
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মেসি। প্রথমার্ধে তিনি একাধিকবার গোলের খুব কাছে পৌঁছালেও সফলতা পাননি। তবে দ্বিতীয়ার্ধে পরিস্থিতি বদলে যায়। মেসির একে কর্নারকে কাজে লাগিয়ে নিকোলাস ওতামেন্দি গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন। এর পর ২২ বছর বয়সি নিকো পাজ একটি দারুণ বাঁকানো শটে দলের ব্যবধান বৃদ্ধি করেন।
সবশেষে, ৭০ মিনিটে আসে সেই উপভোগ্য মুহূর্ত। পেনাল্টি থেকে নিখুঁত একটি শটে তিনি গোল করে নিজের বিদায়কে স্মরণীয় করে তোলেন। গোলের পর সতীর্থরা ছুটে এসে মেসিকে জড়িয়ে ধরেন, যেন তাঁদের অধিনায়কের সঙ্গে শেষবারের মতো উদযাপন করলেন।
ম্যাচ শেষে, মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে আবেগঘন একটি বক্তব্য রাখেন মেসি। তিনি বলেন, আর্জেন্টিনার হয়ে আর মাঠে না নামার বিষয়টি তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। দেশের হয়ে খেলা তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা বলেও মন্তব্য করেন।
মেসি তাঁর সতীর্থ, সমর্থক এবং পরিবারকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণে সতীর্থদের অবদানের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। আবেগঘন কণ্ঠে বাবার মৃত্যুর স্মৃতির কথা তুলে ধরেন, যিনি মাত্র দুই মাস আগে মারা গেছেন। হোর্হে মেসি ওই রাতের অন্যতম স্মরণীয় চরিত্র হয়ে তাঁর মনে ভাসছিলেন।
আর্জেন্টিনার প্রতিনিধিত্বে মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ার শুরু হয় ২০০৫ সালের আগস্টে। এরপর তিনি ছয়টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেছেন এবং তিনবার ফাইনালে পৌঁছেছেন। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করতে সক্ষম হওয়ার পাশাপাশি, ২০২১ ও ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকা শিরোপাও পেয়েছেন।
মেসি দেশের হয়ে ২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোল করেছেন, ফলে তিনি আর্জেন্টিনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং ম্যাচ খেলার রেকর্ডধারী। ২০১১ সাল থেকে তিনি দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও মেসির ফুটবল ক্যারিয়ার এখনও শেষ হয়নি। তিনি বর্তমান সময়ে মেজর লিগ সকারের ক্লাব ইন্টার মায়ামির সদস্য এবং তাঁর চুক্তি ২০২৮ মৌসুমের শেষ পর্যন্ত রয়েছে।
তবে, আর কখনো আর্জেন্টিনার জার্সিতে খেলতে দেখা যাবে না তাঁকে—এটি বুয়েনস আইরেসের সেই রাতকে আরও আবেগময় করে তোলে। ১০ নম্বর জার্সির অধিকারী, যিনি এক প্রজন্মের শৈশব, স্বপ্ন, আনন্দ আর গর্বের মূর্ত প্রতীক, তিনি শেষবারের মতো বিদায় জানালেন।
গোল দিয়ে বিদায়, চোখে জল—আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির শেষ অধ্যায়টিও তাঁর মতো কিংবদন্তির মতোই হয়ে রইল।