বাংলা এবং ভারতীয় সমান্তরাল চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মৃণাল সেন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, যিনি তাঁর অগ্রনিত চিন্তাভাবনা, সূক্ষ্ম সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তববাদী চলচ্চিত্রভাষার মাধ্যমে সিনেমার নীতিমালা বদলেছেন। ২০২৩ সালে, তাঁর ১০৩তম জন্মবার্ষিকীতে, নতুন কিছু সমকালীন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র ঐতিহ্যকে পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে তিনজন আধুনিক বাংলা পরিচালক—কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্ত এবং সৃজিত মুখার্জি—ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে মৃণাল সেনের কাজে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়েছেন।
কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের “পালন” এইভাবে মৃণাল সেনের জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী ছবি “খারিজ”-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। এই সিনেমায় মূল চরিত্রদের বৃদ্ধ বয়সে ফিরে এনে নতুন একটি কাহিনী উপস্থাপন করা হয়েছে। কলকাতার একটি পুরনো এবং জরাজীর্ণ বাড়ির চতুর্ভুজে কাহিনী বিকশিত হয়, যার বিপদসংকেত প্রশাসনের তরফ থেকে দেওয়া হয়। সেই বাড়িতে বাস করা বৃদ্ধ দম্পতি— অঞ্জন ও মমতা সেন— তাদের দীর্ঘস্থায়ী আবাস ছাড়তে বাধ্য হওয়ার ভয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের ছেলে পুপাই ও পুত্রবধূ এই সংকটের মাঝেও পারিবারিক ও বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হন। পুরো চলচ্চিত্রটি কেবল স্মৃতির দৈনন্দিনতা নিয়েই নয়, বরং তা মানুষের আবেগ ও সম্পর্কের জটিলতাকেও তুলে ধরে।
অঞ্জন দত্তের “চলচ্চিত্র এখন” কোনও সরাসরি জীবনীচিত্র নয়; বরং এটি মৃণাল সেনের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের একটি আবেগঘন চিত্র তুলে ধরে। মূল কাহিনীতে তরুণ নাট্যপরিচালক রঞ্জনের গল্প বর্ণিত হয়েছে, যিনি কলকাতার বুদ্ধিবৃত্তিক জটিলতা ও মতাদর্শগত দ্বন্দ্বে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। নাটক মঞ্চস্থ করার প্রক্রিয়ার সময় তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে অভিজ্ঞ চলচ্চিত্র পরিচালক কুণাল সেনের সঙ্গে, যিনি মৃণাল সেনের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁদের কথোপকথনের মাধ্যমে শিল্প, রাজনীতি, প্রতিবাদ এবং সৃষ্টিশীলতার সংকট প্রসারিত হয়। এই চলচ্চিত্রটি প্রচলিত জীবনীচিত্রের কাঠামো ভেঙে একটি আত্মগত ও পরীক্ষামূলক ভাষায় নির্মিত হয়েছে।
সৃজিত মুখার্জির “পদত্তিক” একটি বিস্তৃত বায়োপিক, যা মৃণাল সেনের জীবন ও চলচ্চিত্রের যাত্রাকে গভীরভাবে উপস্থাপন করে। ছবিটি কলকাতার এক তরুণের সংগ্রামের কাহিনী থেকে শুরু করে ভারতীয় সমান্তরাল চলচ্চিত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া তুলে ধরে। চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় মৃণাল সেনের চরিত্রকে পর্দায় জীবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। এই চলচ্চিত্রে সেনের সিনেমার ভাষা, যেমন জাম্প কাট এবং চতুর্থ প্রাচীর ভাঙার কৌশলগুলি দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। তাছাড়াও, সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককেও প্রতিফলিত করা হয়েছে।
এই তিনটি চলচ্চিত্র একটি দিকে মৃণাল সেনের প্রতি একটি শ্রদ্ধা নিবেদন হিসেবে কাজ করে, অপর দিকে তাঁর সিনেমার প্রভাব আজও কতটা প্রাসঙ্গিক— সেটা নতুন করে আমাদের কাছে তুলে ধরে।