রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আগামী শিক্ষাবর্ষের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে স্কুলের পাঠদানের পদ্ধতি, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এবং ছাত্রদের সামগ্রিক উন্নয়নের দিকে নজর রেখে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সুপ্রেন্দু অধিকারী। প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে: স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, পাশ-ফেল প্রথা পুনর্বহালের পরিকল্পনা, এবং ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা।
এছাড়াও, ব্রতচারী, জাতীয় সেবা প্রকল্প (NSS), ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (NCC), সঙ্গীত শিক্ষা এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক কর্মকাণ্ড স্কুল ব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে একত্রিত করার প্রস্তাবগুলি রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, এই পদক্ষেপগুলি শিক্ষার মান এবং পরিবেশকে উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।বেশ বজায় রাখা এবং শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সেই লক্ষ্যেই স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তবে শিক্ষার প্রয়োজনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার পক্ষপাতী নন মুখ্যমন্ত্রী। প্রয়োজন হলে পড়ুয়াদের হাতে ট্যাবলেট তুলে দেওয়ার কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ, অবাধ মোবাইল ব্যবহারের পরিবর্তে শিক্ষার কাজে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রিত ও কার্যকর ব্যবহারের উপর জোর দেওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে।
মুখ্যমন্ত্রী নতুন করে স্কুলের মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে ভাবনা তৈরি করেছেন। এই সংস্কারের অন্যতম প্রধান দিক হলো পাশ-ফেল প্রথা পুনরুদ্ধার করার প্রস্তাব। এটি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত দক্ষতা, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান এবং পড়াশোনার অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে আরও কার্যকরী হবে। এই পদ্ধতির পুনর্বাসনের বিষয়ে আলোচনা চলছে, তবে এটি কোন শ্রেণি থেকে কার্যকর হবে, এটি কবে থেকে চালু হবে এবং মূল্যায়নের নীতিমালা কি হবে, সে সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত সরকারি নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
মুখ্যমন্ত্রী শিক্ষার পাশাপাশি ছাত্রদের মধ্যে দেশের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে চান। ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় আরও গভীরভাবে তৈরি করতে পাঠ্যক্রম ও স্কুলের বিভিন্ন কার্যক্রমে এ বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব জানানো হয়েছে। এছাড়াও, ব্রতচারী কার্যক্রম, NSS এবং NCC-এর মতো উদ্যোগগুলির মাধ্যমে ছাত্রদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ, দেশপ্রেম, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তোলার বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে।
শুধু পাঠ্যবইয়ের পড়াশোনা অথবা পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার ক্ষেত্রে পড়ুয়াদের ব্যক্তিত্ব বিকাশের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সঙ্গীত শিক্ষা ছাড়াও নিয়মিত বিতর্ক, কুইজ এবং বক্তৃতা প্রতিযোগিতার আয়োজনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে পড়ুয়াদের যুক্তিবোধ, সাধারণ জ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে বলেই আশা করা হচ্ছে। একইভাবে, নিজেদের মতামত স্পষ্টভাবে প্রকাশের দক্ষতা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগও বাড়বে।
সব মিলিয়ে, আগামী শিক্ষাবর্ষের প্রস্তুতির প্রেক্ষাপটে রাজ্যের স্কুলশিক্ষায় শৃঙ্খলা, শিক্ষার মানোন্নয়ন, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং ছাত্রদের সার্বিক বিকাশকে লক্ষ্য করে একাধিক পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন রয়েছে, এই প্রস্তাবগুলো কার্যকর করার জন্য কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হবে। এবং তার সময়সীমা কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত ও নির্দেশিকা প্রকাশের পরই এই প্রস্তাবগুলির বাস্তব রূপ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।