বিশ্ববাজারে ইরানের চলমান সংঘাত এবং অপরিশোধিত খনিজ তেলের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির জেরে ভারতীয় মুদ্র বাজারে বড়সড় ধস নামল। সোমবার (১৮ মে) মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির দর সর্বকালের সর্বনিম্ন স্তরে গিয়ে ঠেকেছে। বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দেওয়ায় এশিয়ান মুদ্রাগুলোর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
আজ বাজার খোলার পর থেকেই রুপির পতন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত সেশনের তুলনায় ২০ পয়সা কমে বাজার খোলে ৯৬.১৭-তে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই পতনের গতি আরও তীব্র হয় এবং প্রায় ৩১ পয়সা হারিয়ে ডলার প্রতি রুপির মূল্য দাঁড়ায় ৯৬.২৭ টাকা—যা ভারতের ইতিহাসে রুপির সর্বনিম্ন মান।
এশিয়ায় সবচেয়ে খারাপ পারফর্ম্যান্স রুপির
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ভারতীয় রুপির মূল্য প্রায় ৫.৫% হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত এশিয়ার মুদ্রাগুলোর মধ্যে ভারতীয় রুপির পারফর্ম্যান্স সবচেয়ে খারাপ বলে চিহ্নিত হয়েছে। উল্লেখ্য, আজ সোমবার নিয়ে টানা পাঁচ কার্যদিবসে রুপি তার নিজস্ব রেকর্ডের চেয়ে নিচে নেমে সর্বকালের সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছাল।
বাজার সূত্রে খবর, গত শুক্রবার পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক (RBI) বাজারে বড়সড় হস্তক্ষেপ করেছিল, যার ফলে রুপি সাময়িকভাবে ৯৬-এর ওপরে উঠে আসতে সক্ষম হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেলের আকাশছোঁয়া দামের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে রক্ষা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায়শই বাজারে ডলার ছেড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে।
শক্তিশালী হচ্ছে ডলার, বাড়ছে বন্ডের সুদ
বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা এই ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা এখন ঝুঁকিপূর্ণ বাজার থেকে টাকা তুলে নিরাপদ আশ্রয়ের সম্পদ (safe-haven assets) হিসেবে মার্কিন ডলারে বিনিয়োগ করছেন। ফলে শক্তিশালী হচ্ছে গ্রিনব্যাক। বিশ্ববাজারে ডলার সূচক (dollar index) বেড়ে প্রায় ৯৯.৩০-এর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিবাচক অর্থনৈতিক তথ্য ডলারকে আরও শক্তিশালী করেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে মার্কিন শিল্প উৎপাদন ০.৭% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত ১৪ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং বাজারের প্রত্যাশিত ০.৩%-এর চেয়ে অনেক বেশি। এর ফলে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ এখনই সুদের হার কমাবে না—এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা, যা বিশ্ব পুঁজিকে ডলারের দিকেই টেনে রাখছে।
অন্যদিকে, সোমবার ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদ (yield) ৪ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ৪.৬২৫০%-এ পৌঁছেছে। তেলের উচ্চ মূল্যের কারণে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় বন্ড বিক্রির হিড়িক পড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে ইউরোপ, যুক্তরাজ্য এবং জাপানের বন্ডের ওপরেও
দেশীয় অর্থনীতি ও বাহ্যিক খাতের ওপর চাপ কমাতে এবং ডলারের বহির্গমন রুখতে ইতিমধ্যে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত সরকার। সোনা ও রুপা আমদানির বেশিরভাগ বিভাগের ওপর অবিলম্বে কার্যকর হওয়া কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, অনবশ্যক আমদানি কমানোর এই সরকারি সিদ্ধান্ত এবং আরবিআই-এর ক্রমাগত হস্তক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো রুপির পতন ঠেকানো এবং দেশের ক্রমবর্ধমান চলতি হিসাবের ঘাটতি (current account deficit) নিয়ন্ত্রণে আনা। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে রুপির ওপর এই চাপ বজায় থাকবে বলেই মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।