শরতের আকাশে তুলোর মতো মেঘ, ঠান্ডা বাতাস এবং রাস্তার দু’ধারে দুলতে থাকা সাদা কাশফুল—এই দৃশ্যটি বাঙালির মনে পুজোর আগমনে সৌন্দর্য বিক্ষেপ করে। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের আগমন শুরু হয়। এই মনোরম পরিবেশে শহরের ব্যস্ততা থেকে একদিনের জন্য পালাতে হলে, কলকাতা থেকে খুব বেশি দূরে যেতে হবে না।
কলকাতার অদূরে এমন বেশ কিছু নিরিবিলি স্থান রয়েছে, যেখানে শরতের প্রকৃতি পুরোপুরি তার রূপে ধরা দেয়। কিছু স্থানে নদীর চরে বিস্তৃত কাশবন দেখতে পাওয়া যায়, কিছু জায়গায় বিলের শান্ত জলে নৌকা ভাসিয়ে সময় কাটানো যায়, আবার কিছু স্থানে কাশফুলের সঙ্গে অচিরেই দেখা হয়ে যায় শাপলার। তাই, পুজোর আগে বন্ধুদের বা পরিবারের সঙ্গে একটি ছোটো লং ড্রাইভ কিংবা ফটোশুটের জন্য এই স্থানগুলি ভীষণ উপযোগী হতে পারে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের নিকটেই অবস্থিত দুর্গাবাটি বিল। শহর থেকে বেরিয়ে জুলপিয়া রোডের দিকে অগ্রসর হলেই রাস্তার দু’পাশে শরতের কাশফুল দেখতে পাওয়া যায়। একটু এগোলেই হ্যাপি ভ্যালির কাছে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব দুর্গাবাটি বিল এলাকায়। এখানে জলরাশি এবং সবুজের মাঝে সাদা কাশফুলের সমন্বয়ে এক অনন্য দৃশ্যপট সৃষ্টি হয়। যদি আপনার কাছে কিছু সময় থাকে, তবে নৌকায় চেপে বিলের নানা কোণ ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতাও গ্রহণ করতে পারেন। প্রকৃতির সাথে ছবি তোলার জন্যও স্থানটি বেশ আকর্ষণীয়।
অন্যদিকে, যদি আপনি আরও একটু দূরে ভ্রমণ করতে চান, তবে গাড়ি নিয়ে ঝাড়গ্রামের লালগড়ে চলে যেতে পারেন। কংসাবতী নদীর তীরে শরতের সময়ে যে অপরূপ দৃশ্যের সৃষ্টি হয়, তা দেখলে আপনি কিছুক্ষণের জন্য স্তম্ভিত হতে বাধ্য। নদীর পাশে বিস্তীর্ণ মাঠে ফুটে থাকা কাশফুল দূর থেকে যেন সাদা চাদরের মতো দেখা দেয়। কংসাবতীর সেতুর কাছাকাছি এলাকাতেও কাশের সারি চোখে পড়ে। ঝাড়গ্রামের সাথে লালগড়ের ভ্রমণই আপনার সফরকে আরো রঙিন এবং স্মরণীয় করে তুলবে। যুক্ত করলে একদিনের সফর বেশ জমে উঠতে পারে। তবে কাশফুলের এই রূপ দেখতে গেলে শরতের মরসুমটাই বেছে নেওয়া ভালো।
দামোদরের চর আবির্ভূত হয় সাদা কাশফুলের শোভায়, যা শরতের এই সময়টাতে বিশেষভাবে নজরে পড়ে। হাওড়া থেকে বর্ধমানের দিকে নদীর চরাঞ্চলের নানা স্থানে এই পরিচ্ছদ দেখা যেতে পারে। তবে, যদি কাশফুলের মাঝে কিছুটা সময় হারিয়ে যেতে চান, তাহলে বর্ধমানের মশাগ্রাম আপনার জন্য আদর্শ স্থান। খোলা আকাশের নিচে নদীর তীর এবং বাতাসে দুলতে থাকা কাশফুল—শহরের কোলাহল থেকে এক কিছু ঘণ্টার মুক্তি পেতে এ থেকে ভালো আর কিছু হতে পারে না! আপনি গাড়িতে অথবা ট্রেনে হাওড়া থেকে মশাগ্রামে পৌঁছাতে পারেন।
অন্যদিকে, উত্তর ২৪ পরগনার বর্তির বিলও শরতের এক দিনের সফরের জন্য জনপ্রিয় জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে। কলকাতার পার্শ্ববর্তী ডে-ট্রিপের তালিকায় বেশ কিছু বছর ধরে এই বিল স্থান করে নিয়েছে। বর্ষা শেষে এখানে কাশফুল ফোটে, আর যদি জলের মধ্যে শাপলা পাওয়া যায়, তাহলে প্রকৃতির ছবিটি আরো মনোরম হয়ে ওঠে। কলকাতা থেকে গাড়িতে সহজেই পৌঁছানো যায়। এছাড়া, বারাসাত বা ব্যারাকপুর স্টেশনে নেমে স্থানীয় টোটোয় চড়েও বর্তির বিলের উদ্দেশ্যে চলে যাওয়া সম্ভব।
পুজোর আগে যদি দূরে পাহাড় বা সমুদ্রের পরিকল্পনা না থাকে, তবে মন খারাপ করার কিছু নেই। মহালয়ার সকালে গাড়িতে পছন্দের গানের রেশ, প্রিয় মানুষের সঙ্গ, এবং শহরের অদূরবর্তী নদী বা বিল যেখানে কাশফুল ফুটে রয়েছে—এই শরতের ছোট্ট সফরেও পুজোর আসার সেই বহু প্রতীক্ষিত আনন্দ অনুভব করা সম্ভব। তবে যাত্রা শুরুর আগে স্থানীয় রাস্তাগুলোর অবস্থা, আবহাওয়া এবং কাশফুলের কথা মনে রেখে প্রস্তুতি নিলে ভালো হয়।