ইস্পাতে হ্রদ স্পন্দন

“গণিতকে যদি সঠিকভাবে দেখা যায় তবে তার মধ্যে কেবল সত্যই নয় বরং এক পরম সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যায়, যা ভাস্কর্যের মতোই শীতল এবং সুসংহত”।
-বার্ট্র্রান্ড রাসেল

মানব সভ্যতার বয়স যত বলা হয়, শিল্পের বয়সও ততই হবে, কারণ মানুষ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে, যে বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে, সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছে তার নাম শিল্প। তা কখনো গুহার দেয়ালে আঁচড় কেটে, কখনো পাথর খোদাই করে কিংবা কাঠ, মাটি বা পাথর দিয়ে বিশ্বাসের কোন অবয়ব তৈরীর মধ্য দিয়ে। ফলে মানুষ ও শিল্প একটি সুতোয় বাধা এবং তা অবধারিত সত্তা।

“শিল্পের এক মহা সত্য ও সুসংহত প্রাচীন মাধ্যম- ভাস্কর্য “

মানুষের সভ্যতার সূত্র খুঁজলে, যা দ্বারা বয়স ও সময় নির্ধারণ করা গেছে তা হলো শিল্প এবং আধুনিক ভাষায় তা হল মূর্তি বা ভাস্কর্য শিল্প। দার্শনিক, গণিতবিদ ও সমাজতাত্ত্বিক বার্ট্র্রান্ড রাসেল কিন্তু গাণিতিক সূত্রাবলীর কঠিন সমাধানের ভিতরেও ভাস্কর্যের উষ্ণতার খোঁজ পেয়েছিলেন। তাহলে ভাস্কর্য কি আসলে? পরিষ্কার উত্তর— ত্রিমাত্রিক শিল্পকর্মকে ভাস্কর্য বলে। শিল্পের শুরুতে দুটি মাধ্যম ছিল প্রধান। প্রথমটি চিত্রকলা— যা রেখা ও আলোছায়া ব্যবহারে চিত্রকর্ম নির্মাণ আর দ্বিতীয়টি হল ভাস্কর্য— যা ধরা যায়, ছোঁয়া যায়, যার দৈর্ঘ্য প্রস্থ, উচ্চতা, তল, ঘনত্ব সবই থাকে, আর যা থাকে তা হলো লোহা, ইট, বালি, ইস্পাতের ভিতর প্রাণের, আবেগের সৌন্দর্যবোধের ঘ্রাণ। গুহা যুগ থেকে আজ অবধি শিল্পের নানা শাখার জন্ম হলেও ভাস্কর্য শিল্পে যেন আধুনিকতা নিত্য বিরাজমান।
পৃথিবীতে এমন কোন জাতিসত্ত্বা নেই যাদের প্রাচীন ভাস্কর্য বা স্থাপনার ইতিহাস নেই।
ভারতবর্ষে মূর্তি বা ভাস্কর্যের ইতিহাস অতি প্রাচীন, যা ধর্মীয় আখ্যানের সাথে জড়িত। ভারত ভাগের পর খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে এই ভূমিতে অর্থাৎ বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হয়েছে। ফলে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মূর্তি ও ভাস্কর্য বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির গৌরব বহন করে।

“পাথরের বুকে খোদাই করা শিল্প— ইতিহাস কথা বলে “

অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে নভেরা আহমেদের হাত ধরে এদেশে ভাস্কর্য শিল্পের সূচনা হয়। কিন্তু সময় ধরলে খুব বেশি দিন নয় যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এদেশে ভাস্কর্য শিল্পের সূচনা হয়েছে। ১৯৬৪ সালে ভাস্কর শিল্পী আব্দুর রাজ্জাকের হাত ধরে সূচনা হয় ভাস্কর্য শিক্ষার। এই সূত্রকে যে কজন ভাস্কর এগিয়ে নিয়েছেন তাদের ভাস্কর্যচর্চার ভিতর দিয়ে, তার মধ্যে অন্যতম শিল্পী তৌফিকুর রহমান। তিনি আশির দশকে দেশের শিল্প শিক্ষা শেষ করে বিদেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন এবং সফলভাবে শিল্প শিক্ষার সমাপ্তি ঘটান। স্বদেশে ফিরে শিল্পী নিরবিচ্ছিন্নভাবে শিল্পকর্ম, ভাস্কর্য, স্থাপনাশিল্পসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছেন।

“রেখা গড়ন স্থিতি” শিরোনামে ভাস্কর্য ও রেখাচিত্র নিয়ে শিল্পী তৌফিকুর রহমান হাজির শিল্প প্রেমীদের সামনে। গ্যালারি “কলা কেন্দ্র”- এর দেয়ালে তাই প্রতিভাত হচ্ছে রেখা ও কালির এক ভিন্ন গতি, মাঝে ভাস্কর্য। শিল্পী প্রদর্শনীর শিরোনামের মতোই স্থির আছেন তার নির্মাণ পদার্থের উপর। ধাতবের মতন শক্ত পদার্থকে তিনি বেছে নিয়েছেন এবং একটি অংশের সাথে অন্য অংশ জুড়ে ঝালাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার চিন্তার রূপদান করেছেন। লোহা নিজে যেমন শক্ত, তার মধ্যে প্রাণের সঞ্চার ঘটানো তেমনি আরও শক্ত কাজ— যা শিল্পী করে চলেছেন নিরন্তনভাবে। ভাস্কর্যশিল্পে দৈর্ঘ্য-প্রস্থের পাশেও মসৃণতা একটি বিষয় হিসেবে কাজ করে, যা এই ঝালাই প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকে না। শিল্পী রবীন্দ্রনাথ ভাস্কর্যের মাধ্যমে এক নতুন রবীন্দ্রনাথকে শিল্পপ্রেমীদের সামনে হাজির করেছেন, যা শিল্পীর নিজস্ব অভিব্যক্তির প্রকাশ। এই রবীন্দ্রনাথ যেন একান্তই শিল্পীর। তরুণ, দীপ্ত, বলিয়ান— আবার কোথাও যেন স্থির। ধাতব পাতগুলো পুড়ে পুড়ে নিঃসঙ্গ রবীন্দ্রনাথকে স্থিত করেছে। রবীন্দ্রনাথ যেমন শিল্পের অসংখ্য শাখায় প্রশস্ত, ঠিক তেমনি আলো-ছায়ার গড়নের ভিতর দিয়ে প্রতিটি শক্ত ইস্পাত যেন আলাদা আলাদা রবীন্দ্রনাথকে পাঠ করায়।

“ভাস্কর্য হল বুদ্ধিমত্তার শিল্প “

আবার প্রদর্শনীর অন্য ভাস্কর্যগুলো ভিন্ন বার্তা ও অনুভূতির জন্ম দেয়। ইস্পাতের মোরগ বা ছাগল যা আমাদের প্রাচীন গৃহস্থালির বা পারিবারিক সদস্যের অংশ। সেই প্রাণীর হৃদস্পন্দনও পাওয়া যায় এই কঠিন ইস্পাতের ভিতর দিয়ে। ভাস্কর তৌফিকের “ছাগল” ও বিখ্যাত শিল্পী পিকাসোর “The Goat” শিরোনামে যে ভাস্কর্য, তার মধ্যে অসাধারণ একটি সাদৃশ্য লক্ষণীয়, তা হল মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণ করা “দুই মা ছাগল”। দুগ্ধপূর্ন সুডৌল স্তন— যার অমৃতসুধার জন্য কিনা ছাগলছানা অপেক্ষারত। মোরগ ও ছাগলের গঠনের ভেতর পিকাসোর কিউবিক ফর্মকে কিছুটা মনে করিয়ে দেয়।

শিল্পী তৌফিক মানব দেহের গড়নের সাথে প্রকৃতির রূপান্তর ঘটিয়েছেন এবং তা হৃদস্পন্দন ঠিক রেখে। এদেশের সাধারণ মানুষ এবং বুনো জংলা ফুল-লতাপাতার যে সহবাস, এই দুইকে মিলিয়ে শিল্পী প্রাণের সূত্রপাত করেছেন কঠিন শক্ত ইস্পাতের বুকে।

শিল্পী তৌফিক যে দারুণভাবে সমাজ সচেতন, একইভাবে পুঁজিবাদের যে আবরণ সমাজের ভেতর তিনি যে তারও বিরোধী, তা প্রদর্শনীর কাজগুলোর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। উদাহরণস্বরূপ শরীর— বিশেষত মানব শরীর, কিন্তু প্রতিবাদী হাত— যা কিনা কখনো প্রকৃতির কাছে, কখনো মানব সৃষ্ট আবদ্ধ দ্বান্দ্বিকতায় নিমজ্জিত।

“ভাস্কর্য হলো আলো ও ছায়ার খেলা এটি আসলে পিণ্ড এবং গর্তের ( উঁচু-নিচু নকশার) একটি মেলবন্ধন ” – ভাস্কর অগস্ট রডিন

ভাস্কর্যের কিছু ফর্ম কিছুটা প্রচলিত বাংলায় নকশার সাথে সাদৃশ্য বজায় রেখে চলেছে। শিল্পীর যাপনের যে প্রতিরেখা তা যেন প্রদর্শনীর দেয়ালে অসংখ্য রেখার প্রতিচ্ছবি। আবার কালি দিয়ে শিল্পী তার শৃংখলমুক্ত চেতনার আবহাওয়ার বার্তা তুলে ধরেন। ভাস্কর তৌফিক গ্যালারির আবদ্ধ চার দেয়ালের নির্দিষ্ট আলো-ছায়ার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করা শিল্পী নন, তা তার শিল্পকর্মের ফর্মই বলে দেয়। তারপরও শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান আলো-ছায়ার দারুন এক বিন্যাস ঘটিয়েছেন। এই নাটকীয়তাই কঠিন ইস্পাত ও কথোপকথন করছে আগত শিল্প-রসিকদের সাথে।

শিল্পীর এবারের প্রদর্শনীকে ভাস্কর্য প্রদর্শনী বললে কিছুটা খাটো করা হবে, বরং তা আমরা “ইস্পাতের রূপান্তরবাদ” বলতে পারি। এ যেন কখনো মূর্ত, কখনো বিমূর্ত, কখনো আলো, আবার কখনোবা বাদামি মরিচায় খসে পড়া নতুন স্পন্দন। সামগ্রিক দ্বৈততা নিয়ে চলুক নিরন্তর— এই নতুন প্রাণের সন্ধান, শিল্পের ভাষায়।

রেজাউর রহমান
চিত্রশিল্পী ও লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *