মিউনিখে পুজোর সুর, প্রবাসে কলকাতার নস্টালজিয়া

অক্টোবর ফেস্টের উৎসবের আমেজ তোলার পরই জার্মানির মিউনিখ নতুন উৎসবে সেজে উঠছে। প্রবাসী বাঙালিদের জন্য এই শহরে চলছে তাঁদের প্রিয় উৎসব দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি। ঢাকের বাদ্যি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বাঙালি খাবার এবং কলকাতার স্মৃতির মধ্যে ‘শারদ সম্প্রীতি’ এবার পা রাখতে চলেছে অষ্টম বছরে।
ষষ্ঠী থেকে শুরু করে দশমী পর্যন্ত পাঁচদিন ধরে চলবে পুজোর নানা অনুষ্ঠান। উদ্যোক্তারা বলেন, এ বছরের উৎসবে জাঁকজমকের চেয়ে আন্তরিকতা এবং সম্মিলিত অংশগ্রহণকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় স্থানীয় ভারতীয় দূতাবাসের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে উদ্বোধন হবে পুজোর। পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হবে ডান্ডিয়া আর বার্ষিক পত্রিকার প্রকাশনা।
পুজোর প্রস্তুতিতে বড়দের পাশাপাশি ছোট ছোট উপলব্ধিতে উৎসাহী খুদে শিক্ষার্থীরাও সম্পৃক্ত। ১১ বছর বয়সী মার্কাস যেমন মণ্ডপের নকশা তৈরিতে ব্যস্ত, তেমনি অনেকেই তাদের সৃজনশীলতা নিয়ে এগিয়ে আসছে। প্রতিমা স্থাপন থেকে মণ্ডপের অভ্যন্তর সাজানো—সব কিছুতেই নতুনত্ব আনার চেষ্টা করছেন আয়োজকেরা। পুজোর আচার-অনুষ্ঠানের পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন প্রবাসী বাঙালিরাও, এবং পুরোধা হওয়া মহিলা সদস্যদের ভুমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাঙালির উৎসব মানেই বিশাল আপ্যায়ন। তাই খাবারের তালিকায় রাখা হয়েছে কাতলা কালিয়া, নবমীর পাঠার মাংস, ও দেশি চাটের মতো পরিচিত পদ। পাশাপাশি, আধুনিক ফিউশনের এক টুকরো হিসাবে অ্যাভোকাডো স্যালাডও রাখা হয়েছে। খাবারের মেনুর দায়িত্বে রয়েছেন হাওড়ার সঞ্জীব, যিনি পাঞ্জাবি পরিবার থেকে এসেও বাঙালি সংস্কৃতি ও রান্নার প্রতি গভীর প্রেম অনুভব করেন। মিউনিখের একাধিক রেস্তোরাঁ পরিচালনা করার চাপ সামলে তিনি পুজোর পাঁচটি দিন উৎসবে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত থাকবেন।
এবং উদ্যোগের এইবারের আয়োজনটি অত্যন্ত সহজ ছিল না। উদ্যোক্তা জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, মাত্র দুই মাসের মধ্যে পুরো ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। পুজো আয়োজন করা সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়েও সৃষ্টি হয়েছিল কিছু অনিশ্চয়তা। তবে উদ্যোক্তাদের একত্রিত প্রচেষ্টা এবং দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কের পুজো আয়োজনের পূর্ব অভিজ্ঞতা সেই প্রতিবন্ধকতা কাটাতে সহায়তা করেছে। এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রবাসী বাঙালিদের পাশাপাশি স্থানীয় জার্মান সদস্যরাও একত্রিত হয়ে কাজ করছেন। উৎসবের প্রতিটি দিনে থাকছে আলাদা আকর্ষণ। ষষ্ঠীতে ডান্ডিয়া, সপ্তমীতে আনন্দমেলা এবং অষ্টমীতে সদস্যদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দর্শকদের জন্য আনন্দের উৎস হয়ে থাকবে। তবে সকল চমকের মধ্যে নবমীর রাতে মঞ্চে উঠবে কলকাতার বিখ্যাত বাংলা ব্যান্ড ‘লক্ষ্মীছাড়া’। তাদের পরিবেশনায় মিউনিখের বাঙালিদের মনে ফিরে আসবে কলকাতার কলেজজীবন, বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত এবং শহরের নানা স্মৃতি। পুজোর পুরনো স্মৃতি।
উদ্যোক্তা অমিত সাহা জানান, কলকাতায় গিয়ে পুজোর আনন্দ উপভোগ করা সম্ভব না হলেও, ওই উৎসবের আবহ প্রবাসে তৈরি করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁদের। এ কারণে মিউনিখের এই আয়োজনটি কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং বিদেশের মাটিতে বাঙালির সংস্কৃতি, বন্ধন ও পরিচয় উদ্যাপনের একটি বিশেষ সুযোগ। অক্টোবারের ফেস্টের লক্ষ লক্ষ মানুষ সমাগম হওয়ার পর, মিউনিখ এখন অপেক্ষা করছে আরেকটি উৎসবের। এইবারের পার্থক্য কেবল উদ্যাপনের ভাষাই—শহরের বাতাসে ঢাকের আওয়াজ, ধুনুচির ধোঁয়া, বাংলা গানের সুর এবং ঘরের পুজোর নস্টালজিয়া ভেসে উঠবে। দশমীর সিঁদুরখেলার পর প্রবাসী বাঙালিদের একমাত্র প্রত্যাশা, আগামী বছর আবারও সেই আনন্দ ফিরে আসুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *