প্রতিদিনই কি আমরা হারাচ্ছি রবীন্দ্রনাথকে?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু ঘটেছিল ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট, যা বাংলা ক্যালেন্ডারের ২২ শ্রাবণ। তবে, কবির প্রয়াণের আট দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, এবং একটি প্রশ্ন এখনও নানা ভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে রয়ে গেছে—রবীন্দ্রনাথ কি সত্যিই কেবল ওই দিনটাই আমাদের ছেড়ে গেছেন, নাকি আমরা তাঁকে বিভিন্ন রূপে ‘মেরে’ চলেছি?

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, দীর্ঘ অসুস্থতার পর কবির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটেছিল অস্ত্রোপচারের জটিলতার কারণে এবং তার ফলস্বরূপ তিনি মারা যান। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরও রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে বিতর্ক, ভুল ব্যাখ্যা এবং রাজনৈতিক ব্যবহারের ঘটনা থামেনি। বরং, সময় হিসাবে কবির সাহিত্য, দর্শন এবং মানবতাবাদকে বিভিন্ন মতাদর্শের প্রেক্ষাপটে ফেলে দেওয়ার প্রবণতা ক্রমশ প্রকাশ পেতে থাকে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ যাত্রা একটি নির্মম বাস্তবতার সাক্ষী হয়ে আছে। ২২ শ্রাবণের দিন, বৃষ্টিতে ভেজা কলকাতায় অসংখ্য মানুষ তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাস্তায় উপস্থিত হয়েছিলেন। জনতার প্রবল আবেগের মাঝে শুনা যায়, কবির মৃতদেহ থেকে চুল, দাড়ি এবং নখ সংগ্রহের এক বিতর্কিত ঘটনা ঘটেছিল। যেভাবে তাঁর মরদেহের প্রতি আচরণ করা হয়েছিল, সেটি আজকের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র আবেগ প্রকাশ নয়, বরং একটি অসহায় জনউন্মাদনার প্রতীক।

রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় অনেক রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯২০-এর দশকে ইতালি সফরের সময় ফ্যাসিস্ট নেতা বেনিতো মুসোলিনির সাথে তাঁর সাক্ষাৎ নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে বেশি হয়েছে। সাক্ষাতে কবির কিছু বক্তব্য ও লিখিত প্রশংসা ব্যবহার করে ফ্যাসিবাদের সমর্থক হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে, রোম্যাঁ রোলাঁর সাথে তাঁর সম্পর্ক এবং ইউরোপের অন্যান্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা চলেছিল।পীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভের পর রবীন্দ্রনাথ ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সমালোচনায় আরও দৃঢ় অবস্থান নেন।

১৯১৬ সালে জাপান সফরকালে কবি একটি চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। সেখানে জাপানি সামরিক জাতীয়তাবাদের উত্থান তাঁর মনে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। তিনি তাঁর বক্তৃতা ও লেখায় অন্ধজাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা প্রদান করেন, যা সেই সময় অনেকের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। কবির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের প্রচার, রাজনৈতিক অভিযোগ, এমনকি তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

ইউরোপে রবীন্দ্রনাথের বিষয়ে বিকৃত তথ্যও ছড়িয়ে পড়ে। নাৎসি জার্মানির সময় তাঁর পরিচয় নিয়ে মিথ্যা ও বিদ্বেষমূলক তথ্য প্রচারিত হয়, যেটি ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ পাওয়া যায়। একজন বিশ্বকবি কীভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে কখনও ‘বিশ্বাসঘাতক’, কখনও ‘ইহুদি’ এবং কখনও আবার অন্য পরিচয়ে চিহ্নিত হয়েছেন—এটি আসলে রবীন্দ্রনাথকে বোঝার পরিবর্তে তাঁকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার একটি ইতিহাস। ইতিহাসই বেশি।

রাজনীতি নয়, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি সম্পর্কেও প্রচুর ভ্রান্ত তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। আর্জেন্টিনার ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে কবির ঐতিহাসিক সম্পর্কের সাক্ষী হিসেবে সান ইসিদ্রোর ‘মিরালরিও’ দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন তথ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা এবং অনুসন্ধানের মাধ্যমে সেই বাড়ি সম্পর্কে প্রচলিত অনেক তথ্যের অসঙ্গতিও উন্মোচিত হয়েছে। এই ঘটনার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে, রবীন্দ্র-গবেষণার ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে এই সমস্যা আরও তীব্র হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একের পর এক অবাস্তব গল্প, রাজনৈতিক অপপ্রচার এবং ভুল উদ্ধৃতি সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়েছে। কখনও তাঁকে নজরুলের বিরোধী হিসেবে চিত্রিত করা হয়, কখনও বা কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তাঁর গান, কবিতা কিংবা বক্তব্যের কিছু অংশকে প্রসঙ্গের বাইরে তুলে ধরে একদম আলাদা অর্থ তৈরি করা হচ্ছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কোনো একটি রাজনৈতিক পরিচয়ে আবদ্ধ করা সম্ভব নয়। তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের সমালোচনা যেমন করেছেন, তেমনই অন্ধ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে সতর্কতা জ্ঞাপন করেছেন। মানবমুক্তির কথা বলার পাশাপাশি রাষ্ট্র বা মতাদর্শের নামে ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষতির সম্ভাবনাও তুলেছেন। তাঁর চিন্তার এই জটিলতা তাঁকে সরল রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ হতে বাধা দেয়।

এখানেই সমস্যা। যে রবীন্দ্রনাথকে সম্পূর্ণরূপে নিজের দিকে টানাও সম্ভব নয়, তাঁকে অস্বীকার করার প্রবণতা তৈরি হয়। ফলে একদিকে, তিনি অতিরিক্ত পূজার আসনে বসে জীবনদর্শনের চিন্তক হিসেবে পাঠ্য হন, অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিরোধিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে তাঁর বিশাল সাহিত্যজগতকে সংকীর্ণ করার চেষ্টা করা হয়।

৮ আগস্ট, ২২ শ্রাবণ, শুধুমাত্র মৃত্যুর দিন নয় বরং এটি আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতির জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং দিন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্মরণ করা মানে কেবল তাঁর প্রতিকৃতিতে ফুল দেওয়া বা তাঁর গান গাওয়া নয়; বরং তাঁর রচনা মন দিয়ে পড়া, তাঁর মতামতের পেছনের পরিস্থিতি বুঝতে চেষ্টা করা এবং তাঁর নামের সঙ্গে ছড়ানো তথ্যগুলোর সঠিকতা যাচাই করা জরুরি।

কবির শারীরিক মৃত্যু ঘটেছিল ১৯৪১ সালে। কিন্তু তাঁর চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষাকে ভুলভাবে তুলে ধরা, তাঁর রচনা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা, ভুল উদ্ধৃতি প্রচার করা এবং কখনো কখনো তাঁকে সংকীর্ণ ধারার বন্দীতে পরিণত করার মাধ্যমে, আমরা যেন প্রতিদিন নতুন করে রবীন্দ্রনাথকে স্বীকার করি ও হত্যা করি।
২২ শ্রাবণে, আলোচনা শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু নিয়ে নয়। বরং প্রশ্নটি হলো—আমরা কি সত্যিই রবীন্দ্রনাথকে পড়ে ও বুঝতে পারি, নাকি আমাদের সুবিধার জন্য নিজেদের মধ্যে মুঠো আঁকড়ে ধরেছি একজন রবীন্দ্রনাথকে, এবং প্রতিদিন তাঁকে সেইরকমভাবে হারিয়ে ফেলছি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *