মাটি খনন করতে এবং তার যত্ন নিতে ভুলে যাওয়া মানে নিজেদেরই ভুলে যাওয়া
-মহাত্মা গান্ধী
মাটি পৃথিবীর প্রাণ এবং অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। প্রাণের স্পন্দনকে শব্দময়তার ভেতর দিয়ে নিয়ে যাই মৃত্তিকা। ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে খনিজ ও জৈব দিয়ে তৈরি নরম আবরণ হলো মাটি। প্রশ্ন হল ভূভাগের সব অঞ্চলেই কি মৃত্তিকায় আবৃত। তা কিন্তু নয় কোথাও বিস্তীর্ণ বালুকাময় কোথাও বা শক্ত শিলাখণ্ডের স্তুপ। কিন্তু একমাত্র এই মাটি প্রাণের অস্তিত্বকে ধারণ করে তার বেঁচে থাকার রসদ তৈরিতে প্রধান সহায়ক। পৃথিবীর আদিম সভ্যতার দিকে তাকালে মানুষ প্রথমে বেঁচে থাকার লড়াই এবং তা পৌঁছে যাই ভূমি রক্ষার লড়াই পর্যন্ত। প্রশ্ন হল ভূমির কি রক্ষা হলো? আধিপত্যবাদের সংঘাত না, ভূমিক্ষয়রোধ করবার লড়াই। মাটি যে আরেক মা তা সভ্যতার উৎকর্ষে এসে মানুষ্যকূল প্রায় ভুলতে বসেছে।
মাটির কাছে সহিষ্ণুতা
পেলাম আমি শিক্ষা
আপন কাজে কঠোর হতে
পাষাণ দিল দীক্ষা
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কিছু প্রাণ একত্রিত হয়েছে মাটির কাছে। নিজেদের দায় ও দায়িত্ব কি তা দেখাতে এবং তা শিল্পের ভাষায়। হ্যাঁ একদল তরুণ প্রাণ যারা কিনা শিল্পের বোধকে কাজে লাগিয়ে শক্ত ইট পাথরের সুউচ্চ ইমারতের মাঝে দাঁড়িয়ে সমাজের মানুষকে জানাতে চাইছে মাটি আমাদের অস্তিত্ব। সেই মৃত্তিকাকে তাদের মতন করে খোঁজ করবার চেষ্টায় রত, এবং তা প্রচলিত ভাষা ব্যবহার করে নয় তা বাস্তব বা পরাবাস্তব যেদিক থেকেই তালাস করে দেখি না কেন, তারা স্থাপনাশিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করেছে তাদের অভিমত।
“মৃত্তিকার অন্বেষণে “শিরোনামে স্থাপনা শিল্পের প্রদর্শনীতে হাজির একদল তরুণ শিল্পী।উদ্দেশ্য সবারই এক এবং অভিন্ন তা হল অস্তিত্ব রক্ষা।
মানব সভ্যতার আদিতে অবক্ষয় বা বিলাস কোনোটি ছিলনা। ছিল উত্তরণ ও সম্মুখ যাত্রার অন্তহীন প্রচেষ্টা। ফলে আদিতে গুহাবাসী মানুষ চিত্রকর্মের আশ্রয় নিয়েছে একটি বিশ্বাস থেকে যে বিশ্বাস তাকে আহারের নিশ্চয়তা দিবে। সেখানে শিল্প গৌণ। কি ভাবে, কি দিয়ে, তার বর্ণ কি, তা মুখ্য বিষয় নয়। কিন্তু সভ্যতার উৎকর্ষে এসে শিল্প রূপ পেল বিলাস বাহুল্যের। সৃষ্টি শুরুতে কৌশলগত উৎকর্ষতা ছিল না, ছিল বাস্তবতা। স্থাপনা শিল্পকে আমরা জানি ত্রিমাত্রিক শিল্প ধারা, যা স্পর্শ করা যায়, শব্দ প্রয়োগ করা যায়, ভিন্ন অনুভূতির জন্ম দেয় কিন্তু তা কি বাস্তববাদী না পরা বাস্তববাদী শিল্প?
আঁদ্রে ব্রেতোঁর ভাষাই পরাবাস্তববাদী শিল্পী আশ্রয় নেন প্রতীকের। যে প্রতীক উঠে আসে সামগ্রিক অবচেতন থেকে। এইভাবে দেখলে পরাবাস্তববাদী কাজের প্রধান পরিচয় হলো প্রতিকী ধর্মিতা। যার প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে আছে স্থাপনা শিল্প। প্রতীকী ভাষা ব্যবহার করে শিল্পী হাসেম “The last layer of top Soil ” শিরোনামে স্থাপনাশিল্পে শিল্পী এক নান্দনিক উপস্থাপনা দেখিয়েছেন।শিল্পীর বেড়ে ওঠা তার আশপাশ ও জীবন দর্শনের মিশেল এই শিল্পকর্ম। যেখানে গ্যালারির দেয়ালে পাহাড় সাদৃশ্যতা ও সামনে নব্য উৎকীর্ণ উদ্ভিদ ছানার পৃথিবীতে আগমন এবং ক্ষয় কৃত মৃত্তিকার বর্ণে আবৃত ক্যানভাস। শিল্পীর এই প্রতীকী ধর্মিতার সাথে ব্যবহার্য মৌল গুলো কতখানি অর্থ বহন করে কিংবা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা মনে হয় ভেবে দেখা যেতে পারে।
শিল্পী বনানী ” Food and Existence “শিরোনামের স্থাপনা শিল্পে বাঙালি জাতির ঐতিহ্যকে ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে একটি তাৎপর্যপূর্ণ শিল্প কর্ম স্থাপন করেছেন। মাটিকে মেটাফোরিকভাবে ব্যবহার করে খাদ্য যে মাটিতে উৎপাদিত হয় এবং তা আমাদের অস্তিত্বের প্রধান চালিকাশক্তি তা তিনি সফলভাবে দেখিয়েছেন।
আবার শিল্পী ফয়জুল “Rain in the Eco “শিরোনামে স্থাপন শিল্পী মাটির উপরিভাগে বৃষ্টির গুরুত্ব এবং তা কিভাবে মাটিকে আবার ক্ষয় করছে তা আমাদের সৃষ্ট তা প্রতীকী রূপে উন্মুক্ত স্থানে স্থাপন করেছেন। বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে বৃষ্টির ফোঁটা সাদৃশ্যের মাধ্যমে শিল্পী একটি ব্যঞ্জনা পূর্ণ আবহাওয়া তৈরি করেছেন কিন্তু মৃত্তিকার উপস্থিতি অপ্রতুল।স্থাপনা শিল্পের মূল শক্তি হলো উপকরণ ও বক্তব্যের সমতার উপস্থিতি।
প্রদর্শনীতে ভিন্ন সংস্কৃতির, ভিন্ন ভাষার শিল্পী আছেন।শিল্পী সিঁথি ও রুপশ্রী হাজং যাদের জীবন খুবই ঘনিষ্ঠ ও নির্ভরশীল এই মৃত্তিকা দ্বারা। ঝিরি থেকে পানি সংগ্রহ ও জুমের ফসল এমনকি কাপড় উৎপাদন সবই মৃত্তিকা নির্ভর করে। দুজন শিল্পী তাদের ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের মটিভ ব্যবহার করেছেন। মনোগত প্রতীক সৃষ্টি করা হয়েছে কিন্তু এসব প্রতীকী কতটা মৃত্তিকা ঘনিষ্ঠতার অংশ একটু তালাশ করা প্রয়োজন। কিন্তু একটা শক্ত বিশ্বাস ও ভাবনা আছে তা খুব স্পষ্ট।
“মাটির উপর দিয়ে হাটে সবাই কিন্তু মাটি সহ্য করে নেয় সবই “
শিল্পের যে ধ্রুপদী সত্তা আছে ছন্দ, বিন্যাস, অনুপাত, ইত্যাদি। এই বিষয়গুলো পরাবাস্তববাদী শিল্পে এসে মৃত। শিল্পীর মগ্ন চৈতন্যের সারাংশ কে উপস্থাপন করা হয় তা কখনো পরস্পর বিরোধী হলেও ভাবনাগুলোর বিশ্বাস স্থাপিত হয় শিল্পের ভাষায়।মৃত্তিকার অন্বেষণের শিল্পীরা প্রচলিত ধ্রুপদী শিল্পের সহজ পথ না মাড়িয়ে প্রতীকী ভাষাকে ব্যবহার করেছেন সফলভাবে। শিল্পে প্রশ্ন, উত্তর, প্রতিউত্তর, আছে, ছিল, থাকবে তা মনোগত জটিল ভাবনার দ্বারা উন্মুক্ত করার জন্য সামনে যেতে হবে আরো নতুন ভাষার জন্মের ভেতর দিয়ে, চলুক এই অন্বেষণ
রেজাউর রহমান
চিত্র শিল্পী ও লেখক