শারদীয় দুর্গোৎসবের সবচেয়ে উদযাপিত এবং মহিমান্বিত দিন হলো মহানবমী। এটি যেমন আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে মহাশক্তির চূড়ান্ত বিজয়ের মুহূর্ত, ঠিক তেমনই আধ্যাত্মিক সাধনার পূর্ণতার লগ্ন। সনাতন ঐতিহ্য, নবরাত্রির আচার এবং ভরত মুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’-এর গভীর দর্শন—এই তিনের এক অপূর্ব সংযোগ ঘটে নবমী তিথিতে। এই বছরের নবম দিনের বিশেষ আকর্ষণ হলো এর নির্ধারিত উৎসবের রঙ— ‘পিকক গ্রিন’ বা ময়ূরকণ্ঠী সবুজ।
বাঙালি সংস্কৃতিতে মহানবমীর মহিমা
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের সেরা উৎসব দুর্গাপূজা। আর নবমী হলো এই উৎসবের পরম প্রাপ্তির দিন। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুসারে, এই তিথিতেই দেবী দুর্গা মহিষাসুর বধ সম্পন্ন করে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ রূপে ত্রিলোক রক্ষা করেছিলেন। নবমীর সকালে মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর মহাস্নান এবং ষোড়শোপচারে পূজার ধুম পড়ে যায়। এরপর শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী ধুনুচি নাচ আর সন্ধিপূজার রেশ ধরে এক অদ্ভুত আবেগ, যা আনন্দের চরম শিখরে পৌঁছে দেয় সবাইকে।
নবরাত্রির নবম দিন এবং দেবী সিদ্ধিদাত্রী
নবরাত্রির নবম দিনে দেবী দুর্গার নবম রূপ ‘দেবী সিদ্ধিদাত্রী’-র উপাসনা করা হয়। সিংহবাহিনী ও চতুর্ভুজা এই দেবী হলেন সমস্ত অলৌকিক ক্ষমতা, জ্ঞান এবং ‘সিদ্ধি’-র দাতা। শাস্ত্র অনুযায়ী, স্বয়ং ভগবান শিবও এই দেবীর কৃপায় সমস্ত প্রকার আটটি মূল সিদ্ধি লাভ করেছিলেন এবং তাঁর শরীর অর্ধনারীশ্বর রূপে রূপান্তরিত হয়েছিল। দেবী সিদ্ধিদাত্রী অজ্ঞানতা দূর করে ভক্তদের আধ্যাত্মিক পূর্ণতা ও মোক্ষ প্রদান করেন।
নবম দিনের বিশেষ রঙ: ময়ূরকণ্ঠী সবুজ বা পিকক গ্রিন
নবরাত্রি বা শারদীয় উৎসবের প্রতিটি দিনের একটি নিজস্ব রঙ থাকে। নবম দিনের নির্ধারিত রঙ হলো ‘পিকক গ্রিন’ বা ময়ূরকণ্ঠী সবুজ। এই রঙটি অত্যন্ত রাজকীয়, যা নবরাত্রির উৎসবের সমাপ্তিকে এক অনন্য মর্যাদা দেয়। ময়ূরকণ্ঠী সবুজ রঙটি মূলত প্রকৃতি, নতুন সূচনা, সহানুভূতি, সমৃদ্ধি এবং আত্মিক বৃদ্ধির প্রতীক। নবমীর দিন ভক্তরা এই রঙের পোশাক পরিধান করে দেবী সিদ্ধিদাত্রীর আরাধনা করেন, যা অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করে জীবনের পূর্ণতা ও জ্ঞানের বিকাশকে উদযাপিত করে।
নাট্যশাস্ত্রের সংযোগ: নবম দেবী ও শান্ত রস
ভরত মুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’ এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যে নবরাত্রির নয়টি দিন মানুষের নয়টি মানসিক অনুভূতি বা ‘নবরস’-এর সাথে গভীরভাবে যুক্ত। নবরাত্রির এই যাত্রা শুরু হয় ‘শৃঙ্গার রস’ (প্রেম ও সৌন্দর্য) দিয়ে এবং এর চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক সমাপ্তি ঘটে নবম দিনে ‘শান্ত রসে’।
নাট্যশাস্ত্রে ‘সিদ্ধি’ শব্দের অর্থ হলো কোনো নাট্য বা শৈল্পিক পরিবেশনার চূড়ান্ত পারফেকশন বা আধ্যাত্মিক সাফল্য। একজন শিল্পীর জন্য অহংকার বিসর্জন দিয়ে পরম সৃষ্টিশীলতায় পৌঁছানোই হলো দেবী সিদ্ধিদাত্রীর আশীর্বাদ। নবম দিনে যখন সমস্ত আসুরিক শক্তির বিনাশ ঘটে, তখন মানুষের মন সমস্ত জাগতিক কোলাহল পেরিয়ে এক পরম প্রশান্তিতে নিমজ্জিত হয়। এই মানসিক অবস্থাই হলো ‘শান্ত রস’। দেবী সিদ্ধিদাত্রী যেমন ভক্তকে সাধনার অন্তিম লক্ষ্যে পৌঁছে দেন, নাট্যশাস্ত্রের ‘শান্ত রস’-ও ঠিক তেমনই সমস্ত চঞ্চল আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে এক পরম আনন্দ ও আত্মোপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়।