বাংলার প্রাচীন লোকশিল্পের একটি বিশেষ নিদর্শন, বিষ্ণুপুরের হিংগুল বা হীমপুতুল, এবার নতুন একটি আলোর দিকে ধাবিত হয়েছে। জনপ্রিয় বলিউড পরিচালক ইমতিয়াজ আলির কাছে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের একটি বিশেষ রূপ পৌঁছেছে। কলকাতার শিল্পী এবং কনটেন্ট নির্মাতা সুবাঙ্গী মজুমদারের দ্বারাই তৈরি হয়েছে একটি অভিনব চিত্রকর্ম, যা শতাব্দীপ্রাচীন তেপাপুতুলের ঐতিহ্যকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসছে।
দক্ষিণ কলকাতার একটি প্রেক্ষাগৃহে ‘ম্যায় ভাপাস আউঙ্গা’ ছবির বিশেষ প্রদর্শনীতে সুবাঙ্গী ইমতিয়াজ আলির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই অনুষ্ঠানে তিনি পরিচালককে উপহার হিসেবে একটি ছোট পেইন্টিং প্রদান করেন। ২০০৭ সালের অত্যন্ত জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘জাব উই মেট’-এর পোস্টারকে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি, যেখানে মূল চরিত্রগুলির মুখের জায়গায় বিষ্ণুপুরের হিংগুল পুতুলের অবয়ব স্থাপন করা হয়েছে। শিল্পকর্মটি দেখে মুগ্ধ হয়ে ইমতিয়াজ আলি সেটিতে স্বাক্ষর করেন এবং এরপর আবার এটি শিল্পীর হাতে ফিরিয়ে দেন।
সুবাঙ্গীরের এই উদ্যোগটি কেবল এক উপহারই নয়, বরং এটি বাংলার প্রায় হারিয়ে যাওয়া লোকশিল্পকে নতুন প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করার একটি প্রচেষ্টা। তিনি উল্লেখ করেছেন, ইমতিয়াজ আলির ছবি ‘ম্যায় ভাপাস আউঙ্গা’-তে পাঞ্জাবের দেশভাগের বেদনা যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি তিনি বাংলার দেশভাগের স্মৃতি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে তেপাপুতুলকে নির্বাচন করেছেন।
শিল্প ইতিহাসবিদ সৌজিত দাসের মতে, তেপাপুতুল আসলে নির্দিষ্ট কোনো পুতুলের নাম নয়, বরং এটি বাংলার হস্তনির্মিত মাটির পুতুলের একটি বিশেষ ধারার পরিচয় বহন করে। ভেজা মাটি দিয়ে আঙুলের সাহায্যে ফুটিয়ে তোলা হয় এই পুতুলগুলো। এই ঐতিহ্যের মধ্যে বিষ্ণুপুরের হিংগুল বা হীমপুতুল একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
ছোট আকার, সহজ ডিজাইন এবং উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার হিংগুল পুতুলকে বিশেষ করে চেনার উপযোগী করে তুলেছে। সূর্যের তাপে শুকনো মাটির এই পুতুলে ব্যবহার করা হয় প্রাকৃতিক সিঁদুর-লাল রঙ, যা হিংগুল নামে পরিচিত, এবং বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিজ্জ রং। বাংলার অন্যান্য তেপাপুতুলের মধ্যে রয়েছে জউ, ষষ্ঠী, আহ্লাদ-আহ্লাদি, গৌরাঙ্গ, কাঠালিয়া এবং দেওয়ালি পুতুল।
তেপাপুতুলের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। সৌজিত দাস জানাচ্ছেন, সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নস্থল থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের চন্দ্রকেতুগড়েও হাতের তৈরি মাটির মূর্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। এই শিল্পটি কোনো রাজদরবারের কর্মশালার নির্মাণ নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাপন ও সংস্কৃতির সঙ্গেই জড়িত একটি জনগণের শিল্প, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংরক্ষিত হয়ে আসছে।
বিষ্ণুপুরের হিংগুল পুতুল তৈরির ঐতিহ্য এখনো ফৌজদার পরিবারের মহিলাদের হাতে জীবন্ত রয়েছেন। এক সময় এই পরিবারটির সম্পর্ক ছিল বিষ্ণুপুরের রাজপরিবারের সঙ্গে, এবং তাদের উপশমে আজও এই বিশেষ পুতুল তৈরির কুশলতা সংরক্ষিত আছে।
সৌজিত দাসের মতে, শহরের আধুনিক রুচিতে অনেক সময় তেপাপুতুলকে সাধারণ বা কম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। এ কারণে এর আসল শিল্পমূল্য এখনও প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি পায়নি। যদিও আধুনিক বাজারের চাহিদার কারণে অনেক লোকশিল্প নতুন রূপ ধারণ করেছে, তবুও এর মূল সাংস্কৃতিক পটভূমি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এক সময় অবিভক্ত বাংলার ঢাকা ও রাজশাহী থেকে শুরু করে বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া অঞ্চলে তেপাপুতুলের এক বিস্তৃত প্রচলন ছিল। কিন্তু দেশভাগের পর নানা সাংস্কৃতিক জবঙ্গের মতো, এই শিল্পও আস্তে আস্তে হারিয়ে যেতে শুরু করে। সুবাঙ্গী তার শিল্পকর্মের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যটি ফের মানুষের সামনে হাজির করার চেষ্টা করছেন।
তিনি আশা করেন, এই উদ্যোগের ফলে যদি মানুষ তেপাপুতুলের ইতিহাস জানার প্রতি আগ্রহী হয়, শিল্পীদের প্রতি সমর্থন জানায়, এবং বাংলার লোকঐতিহ্য রক্ষায় এগিয়ে আসে, তাহলে এই প্রাচীন শিল্প আবারও নতুন প্রাণ পাবে।