কাশ্মীরে হারানো দাদার স্মৃতি, নোবেলজয়ী অ্যান কারসনের ‘নক্স’-এ ভারতের ছোঁয়া

সাহিত্যে ২০২৬ সালের নোবেলজয়ী কানাডার কবি ও লেখক অ্যান কারসনের জীবনজুড়ে এক স্পর্শকাতর অধ্যায় রয়েছে ভারতের সঙ্গে। তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘নক্স’ (Nox)-এ আমরা দেখতে পাই দীর্ঘ ২২ বছর ধরে বিচ্ছিন্ন থাকা তাঁর ভাই মাইকেল কারসনের স্মৃতি, তাঁর রহস্যময় জীবনযাপন এবং কাশ্মীরের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তিগত অনুসঙ্গ। ৭৬ বছর বয়সী অ্যান কারসন সমকালীন সাহিত্যে তাঁর অসাধারণ অবদানের জন্য ৮ অক্টোবর নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন। তবে তাঁর সাহিত্যযাত্রার অন্যতম আবেগঘন সৃষ্টি ‘নক্স’, যা প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। এই বইয়ের মূল বিষয়বস্তু হল তাঁর ভাই মাইকেল, যিনি ১৯৭৯ সালে মাদক-সংক্রান্ত একটি অপরাধের কারণে কানাডা ত্যাগ করেন।

এর পরের ২২ বছর ধরে মাইকেল কাটান ভারত ও ইউরোপের নানা স্থানে। অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করে এবং পরিবারের সঙ্গে কিঙ্কর্তব্য বিমূঢ় থেকে জীবন কাটিয়েছেন একজন ভবঘুরের মতো। মাঝে মাঝে বাড়িতে ফোন করতেন, এবং তাঁর পরিবারের কাছে একটি চিঠিও পাঠিয়েছিলেন, যা তাঁদের মা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সংরক্ষণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেই চিঠিটি অ্যানের কাছে পৌঁছায়।

‘নক্স’ বইয়ে মাইকেলের জীবন ও স্মৃতি পুনরুদ্ধার করতে অ্যান ব্যবহার করেছেন পুরনো ছবি, চিঠি, হাতে লেখা নোট এবং নানা ব্যক্তিগত স্মারক। তাঁর দাদার ভ্রমণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হোটেলগুলির নথিপত্রের মধ্যে কাশ্মীরের স্মৃতিবাহী স্টেশনারিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই সামান্য উপকরণগুলিই বইটিতে একটি হারিয়ে যাওয়া জীবনের একটি ছিন্নভিন্ন ছবি তুলে ধরে।

২০০০ সালে আচমকাই ডেনমার্কের কোপেনহেগেন থেকে অ্যানকে ফোন করেন মাইকেল। বোনের শৈশবের ডাকনাম ব্যবহার করে তাঁকে সম্বোধন করে দেখা করতে আসার অনুরোধ জানান।নান তিনি। দাদার সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনাও করেছিলেন অ্যান। কিন্তু সেই যাত্রা আর বাস্তবায়িত হয়নি। যাওয়ার আগেই তিনি জানতে পারেন, মাইকেল মারা গিয়েছেন। শেষবারের মতো দাদার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ আর পাননি তিনি।এই অপূর্ণতা, বিচ্ছেদ ও স্মৃতির টুকরো টুকরো অংশ নিয়েই তৈরি ‘নক্স’। প্রচলিত বইয়ের কাঠামো ভেঙে এটি তৈরি করা হয়েছে একটি বাক্সের মধ্যে রাখা দীর্ঘ অ্যাকর্ডিয়ন-ভাঁজের পাতায়।

ব্যক্তিগত ছবি, চিঠিপত্র, অনুবাদ এবং স্মৃতির টুকরোগুলি মিলিয়ে লেখাটি একজন ভাইবোনের জটিল সম্পর্কের একটি অনন্য দলিল হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে। এই সৃষ্টির পেছনে প্রাচীন রোমান কবি ক্যাটুলাসের প্রভাবও স্পষ্ট। ভাইয়ের মৃত্যুর পর ক্যাটুলাস যেভাবে দূরপ্রান্তে তাঁর সমাধি ও স্মৃতির প্রতি শোক প্রকাশ করেছিলেন, অ্যানের নিজের শোকের অনুভূতি তার সঙ্গেই গভীরভাবে যুক্ত। ‘নক্স’-এর বৈশিষ্ট্য শুধু পরিবারের হারিয়ে যাওয়া সদস্যকে স্মরণ করা নয়; বরং এটি সময়, দূরত্ব, বিচ্ছেদ এবং মৃত্যু সত্ত্বেও বেঁচে থাকা সম্পর্কের অনুভূতিগুলোকে সাহিত্যিক ভাষায় ফুটিয়ে তোলে। মাইকেলের জীবনযাত্রার কিছু চিহ্ন, বিশেষত কাশ্মীরের স্মৃতি, এই বইয়ে একটি অপ্রত্যাশিত ভারতীয় সূচনা তৈরি করেছে। অ্যান কারসনের নোবেল পুরস্কার তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভাকে নতুনভাবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দিয়েছে। ‘নক্স’ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে কখনও কখনও ব্যক্তিগত শোকের অভিজ্ঞতার গভীরতা তাত্পর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।ষুদ্রতম স্মারকও হয়ে উঠতে পারে বিশ্বসাহিত্যের এক অসামান্য সৃষ্টি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *